মাগুরার নদী ব্যবস্থাপনা ও ভাঙন রোধে কৃষিবিদ ড. আলী আফজালের ২০ প্রস্তাবনা
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার :
ঢাকাস্থ মাগুরা ফোরামের চেয়ারম্যান কৃষিবিদ জনাব ড. আলী আফজাল মাগুরা জেলার নদী ভাঙন রোধ ও নদী ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ২০টা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছেন।
মাগুরা জেলার নদীভাঙন রোধ, নদীতীর সংরক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনার জন্য সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
মাগুরা জেলার নদী ও নদীতীরবর্তী জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষিজমি, বসতভিটা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
নদীভাঙন কোনো একক পরিবারের সমস্যা নয়; এটি একটি এলাকার অর্থনীতি, পরিবেশ, কৃষি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
এ অবস্থায় শুধু ভাঙন শুরু হওয়ার পর জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে আগাম ঝুঁকি শনাক্তকরণ, তীর সংরক্ষণ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে ঢাকাস্থ মাগুরা ফোরাম মনে করে।
সম্প্রতি ঢাকাস্থ মাগুরা ফোরামের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিম্নলিখিত ২০ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন কৃষিবিদ ড. আলী আফজাল।
১. নদীভাঙন ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি
মাগুরা জেলার নদী ও নদীতীরের ভাঙনপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি জেলাভিত্তিক নদীভাঙন ঝুঁকি মানচিত্র প্রণয়ন করতে হবে।
২. জরুরি ভাঙনপ্রবণ এলাকা চিহ্নিতকরণ
বর্ষা মৌসুমের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. জরুরি তীর সংরক্ষণ
প্রয়োজন অনুযায়ী জিওব্যাগ, জিওটেক্সটাইল, ব্লক, পাথরসহ বৈজ্ঞানিকভাবে অনুমোদিত উপকরণ ব্যবহার করে জরুরি তীর সংরক্ষণ করতে হবে।
৪. স্থায়ী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প
দীর্ঘদিন ধরে ভাঙনের শিকার এলাকাগুলোতে সমীক্ষার ভিত্তিতে স্থায়ী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
৫. নদীর গতিপথ ও স্রোত সমীক্ষা
নদীর স্রোত কোন কোন স্থানে তীরে আঘাত করছে এবং কোথায় ভাঙনের ঝুঁকি বেশি—তা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ণয় করতে হবে।
৬. প্রয়োজনীয় স্থানে নদী পুনঃখনন
যেখানে অতিরিক্ত পলি জমে নদীর প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে, সেখানে যথাযথ সমীক্ষা ও পরিবেশগত বিবেচনার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পুনঃখনন করতে হবে।
৭. অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ
নদীর তলদেশ থেকে অপরিকল্পিত ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর নজরদারি ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৮. নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথ রক্ষা
নদী দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
৯. নদীতীরের অবৈধ দখল উচ্ছেদ
সরকারি নদী ও নদীতীরের জমি অবৈধ দখলমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
১০. নদীতীরে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ
উপযুক্ত এলাকায় স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বৃক্ষ ও ঘাস রোপণের মাধ্যমে নদীতীরের মাটি সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে হবে।
১১. গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা
নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, বাজার, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রক্ষা করতে হবে।
১২. নদীভাঙন জরুরি তহবিল
মাগুরার জরুরি নদীভাঙন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সরকারি বরাদ্দ ও বিশেষ তহবিল নিশ্চিত করতে হবে।
১৩. বর্ষার আগে প্রতিরোধমূলক কাজ
ভাঙন শুরু হওয়ার পর কাজ না করে বর্ষার পূর্বেই সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে হবে।
১৪. স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ
ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং জনগণের সমন্বয়ে নদীভাঙন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
১৫. ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন
নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ আবাসন, ভূমি, খাদ্য ও জীবিকার পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
১৬. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা
নদীগর্ভে জমি হারানো কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তা, পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
১৭. নদীভাঙনের তথ্যভাণ্ডার
প্রতি বছর নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত জমি, পরিবার, অবকাঠামো ও এলাকার তথ্য সংরক্ষণ করে একটি হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে হবে।
১৮. বিশেষজ্ঞ পরামর্শক কমিটি
পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রকৌশলী, পানি ও নদী বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, প্রশাসন এবং স্থানীয় জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পরামর্শক কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
১৯. “মাগুরা নদী ব্যবস্থাপনা মাস্টারপ্ল্যান”
মাগুরার নদীভাঙন, বন্যা, নাব্যতা, জলাবদ্ধতা, নদী দখল ও পরিবেশ—সব বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি “মাগুরা নদী ব্যবস্থাপনা মাস্টারপ্ল্যান” প্রণয়ন করতে হবে।
২০. গণশুনানি ও জবাবদিহি
নদীভাঙন প্রতিরোধে গৃহীত প্রকল্পের অগ্রগতি, ব্যয় ও কাজের মান সম্পর্কে স্থানীয় জনগণকে অবহিত করতে নিয়মিত গণশুনানি ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে।
বাস্তবায়নের জন্য তিনি আহ্বান জানান।
ঢাকাস্থ মাগুরা ফোরাম মনে করে, মাগুরার নদীভাঙন রোধ কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক বিষয় নয়; এটি মাগুরার মানুষের জীবন, সম্পদ, কৃষি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
অতএব, উপরোক্ত প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ কামনা করছি।
তিনি দাবি করেন,
“ভাঙন শুরু হওয়ার অপেক্ষা নয়—ভাঙনের আগেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা চাই।”
“নদী বাঁচলে মাগুরা বাঁচবে,
নদীতীর রক্ষা হলে মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা পাবে।”
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: