কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্ষমতার নতুন রাজনীতি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার একটি মৌলিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা কিংবা কূটনৈতিক প্রভাব—এই তিনটি ঐতিহ্যগত ক্ষমতার স্তম্ভের পাশে এখন যুক্ত হয়েছে ডেটা ও অ্যালগরিদমভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ। ফলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক, শাসনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে।
রাষ্ট্রের হাতে থাকা তথ্যের পরিমাণ অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। নাগরিকের চলাচল, যোগাযোগ, অনলাইন আচরণ, কেনাকাটা, এমনকি চিন্তাভাবনার প্রবণতাও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে এআই-ভিত্তিক সিস্টেমের মাধ্যমে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যে রাষ্ট্র যত বেশি ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে পারছে, সে রাষ্ট্র তত বেশি সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই এখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, স্মার্ট নজরদারি ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় সন্দেহ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা—এসব প্রযুক্তি শহর, সীমান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যবহৃত হচ্ছে। সরকারের যুক্তি একটাই: অপরাধ দমন, সন্ত্রাস প্রতিরোধ এবং জননিরাপত্তা। কিন্তু মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রযুক্তিগুলো প্রায়ই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বাইরে থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশেষ করে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোতে এআই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠছে। বিরোধী কণ্ঠ শনাক্ত করা, প্রতিবাদ পূর্বাভাস দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত বিশ্লেষণ—এসব এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্ভব। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে বিরোধী রাজনীতিকে দমন করার জন্য সরাসরি শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন কমে আসবে; প্রযুক্তিই সেই কাজ করবে নীরবে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও এই প্রবণতার বাইরে নয়। নিরাপত্তা ও দক্ষতার যুক্তিতে অনেক দেশ নাগরিক নজরদারি বাড়াচ্ছে। তবে পার্থক্য হলো—গণতান্ত্রিক কাঠামোতে এই ব্যবস্থাগুলোর ওপর আইনি ও বিচারিক নজরদারি থাকার কথা। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রযুক্তির গতির সঙ্গে আইন ও নীতিমালা প্রায়ই তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না।
ক্ষমতার এই নতুন রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভূমিকা। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিজে প্রযুক্তি তৈরি করছে না; বরং বড় কর্পোরেশনগুলোর ওপর নির্ভর করছে। এতে করে ক্ষমতার একটি অংশ রাষ্ট্রের হাত ছেড়ে কর্পোরেট কাঠামোর ভেতরে চলে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে “রাষ্ট্র বনাম নাগরিক” দ্বন্দ্বের পাশাপাশি “রাষ্ট্র–কর্পোরেশন–নাগরিক” ত্রিমুখী টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হবে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এআই একটি নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। কে বেশি শক্তিশালী অ্যালগরিদম তৈরি করতে পারছে, কে বেশি ডেটা নিয়ন্ত্রণ করছে—এসব বিষয় এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেবে মানুষ নয়, অ্যালগরিদম। লক্ষ্য নির্ধারণ, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, এমনকি আক্রমণের সময় নির্ধারণেও এআই ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসছে—রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ছে, না কি নাগরিকের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে? প্রযুক্তি নীতিবিদদের মতে, সমস্যাটি এআই নিজে নয়; সমস্যা হলো এর ব্যবহার পদ্ধতি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত না করা হলে এআই ধীরে ধীরে একটি অদৃশ্য শাসনব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।
ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এআই রাষ্ট্রকে আরও দক্ষ, দ্রুত ও পূর্বাভাসভিত্তিক করে তুলবে। একই সঙ্গে এটি সমাজকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও পর্যবেক্ষণাধীন করে তুলবে। ক্ষমতা তখন আর শুধু বন্দুক বা ব্যালটের মাধ্যমে প্রকাশ পাবে না; প্রকাশ পাবে কোড, সার্ভার এবং ডেটাসেন্টারের মাধ্যমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃতি বোঝার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্রে না রেখে বিশ্লেষণ করা আর সম্ভব হবে না। যে রাষ্ট্র এই প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে, সে রাষ্ট্রই রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্ধারণে এগিয়ে থাকবে। প্রশ্ন একটাই—এই ক্ষমতা কার স্বার্থে, এবং কোন সীমার মধ্যে ব্যবহৃত হবে।
দৈনিক পুনরুত্থান / বাসিদ উর রহমান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: