বিশ্ব সংঘাত এবং ভবিষ্যৎ
বিশ্ব রাজনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কোনো সংঘাত আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতিটি যুদ্ধ, প্রতিটি উত্তেজনা, প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া—সবকিছু মিলিয়ে একটি বৃহৎ অস্থির কাঠামো তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বৈশ্বিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনে।
ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে যে বিশ্বব্যবস্থার ফাটল স্পষ্ট হয়েছিল, তা এখন আরও চওড়া হয়েছে। রাশিয়া ও পশ্চিমা জোটের মুখোমুখি অবস্থান কেবল ইউক্রেন সীমাবদ্ধ নেই। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যত একটি “প্রক্সি ওয়ার”, যেখানে ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামো নতুন করে সাজানো হচ্ছে। ন্যাটোর সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, পূর্ব ইউরোপে সেনা মোতায়েন এবং রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক কৌশল—সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম, বরং এটি একটি দীর্ঘ সময় ধরে নিম্ন ও উচ্চ তীব্রতার মধ্যে ঘুরপাক খেতে পারে।
এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। জ্বালানি বাজার অস্থির, খাদ্য সরবরাহ চেইন চাপের মুখে। বিশ্বব্যাংকের একাধিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে চিত্র আরও জটিল। ফিলিস্তিন–ইসরাইল সংঘাত নতুন কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর মাত্রা এবং প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। গাজা উপত্যকায় মানবিক সংকট, পশ্চিম তীরে উত্তেজনা এবং ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ক্রমাগত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে আরও চরমপন্থা ও সহিংসতার জন্ম দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এই সংঘাত এখন আর শুধু দুই পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আঞ্চলিক রাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। লেবানন, সিরিয়া এবং ইরানের প্রভাব এখানে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ইরান এই পুরো সমীকরণের কেন্দ্রে অবস্থান করছে—একদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের কৌশল।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরাইলের উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলো বলছে, ইরান এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে তারা প্রযুক্তিগতভাবে খুব দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, যদিও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত নয়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরান পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে যাবে। সৌদি আরবসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোও তখন নতুন নিরাপত্তা কৌশলে যেতে বাধ্য হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট—তারা কোনোভাবেই ইরানকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় না। ফলে ভবিষ্যতে সীমিত বা পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘর্ষের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। যদিও সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি অত্যন্ত বড়, তবুও ছায়াযুদ্ধ, সাইবার হামলা এবং প্রক্সি সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
এশিয়ার দিকে তাকালে চীন–তাইওয়ান উত্তেজনা আরেকটি বড় উদ্বেগের কারণ। চীন স্পষ্টভাবে তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাইওয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তাইওয়ান ইস্যুতে কোনো সংঘাত শুরু হলে তা হবে বৈশ্বিক পর্যায়ের সংকট, যার প্রভাব প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং সামরিক জোটে পড়বে।
এই সব সংঘাতের মধ্যে একটি বিষয় পরিষ্কার—ভবিষ্যতের যুদ্ধ আর শুধু ট্যাংক ও সৈন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সাইবার আক্রমণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন এবং তথ্যযুদ্ধ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, ভবিষ্যতে একটি বড় অংশের সংঘাত হবে “অদৃশ্য যুদ্ধ”, যেখানে বিদ্যুৎ গ্রিড, ব্যাংকিং সিস্টেম এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাই প্রধান লক্ষ্য হবে।
বিশ্বের অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন, আমরা এমন এক সময়ে প্রবেশ করছি যেখানে সংঘাত হবে দীর্ঘস্থায়ী, বহুস্তরবিশিষ্ট এবং অনিশ্চিত। একদিকে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি, অন্যদিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ—এই দুইয়ের মিশ্রণ বিশ্বকে আরও অস্থির করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটি সাধারণ মত হলো, যদি বড় শক্তিগুলো কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আগামী দশকটি হতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে অস্থিতিশীল অধ্যায়। তবে একই সঙ্গে এটাও বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সংলাপ এবং বাস্তবভিত্তিক কূটনীতি এই অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে—যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।
বিশ্ব এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই পথ কোথায় গিয়ে থামবে—তা নির্ভর করছে বর্তমান সিদ্ধান্তগুলোর ওপর। যুদ্ধের পথ সহজ, কিন্তু তার মূল্য বহুগুণ বেশি। শান্তির পথ কঠিন, কিন্তু সেটিই একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী সমাধান।
দৈনিক পুনরুত্থান / বাসিদ উর রহমান
- বিষয়:
- বিশ্বসংঘাত* এবং,ভবিষ্যৎ
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: