বাবাকে জ্যান্ত কবর দিতে ঘরেই খোঁড়া হয় গর্ত, অতঃপর...
জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে পঙ্গু ও অসহায় বাবাকে জীবন্ত মাটিচাপা দিয়ে হত্যার উদ্দেশে ঘরের ভেতর গোপনে প্রায় ৫ ফুট প্রস্থ ও ৭ ফুট গভীর এক বিশাল গর্ত খোঁড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় ওই ছেলেকে হাতেনাতে আটক করে গণধোলাই দিয়েছেন ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী। তবে থানায় অভিযোগ দায়েরের কথা বলে মাদকাসক্ত ওই ছেলেকে গ্রামবাসীর কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কৌশলে এলাকা ছেড়েছেন তার মা ও বোন।
বুধবার (৮ জুলাই) উপজেলার বানিয়াচাপড় গ্রামে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বানিয়াচাপড় গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম (৪৮) একসময় বেশ সচ্ছল ছিলেন। স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার ছিল তার। কিন্তু পাঁচ বছর আগে গাছ থেকে পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ড ভেঙে পঙ্গুত্ব বরণ করেন তিনি। কোমর থেকে দুই পা অবশ হয়ে যাওয়ায় ৫ বছর ধরে বিছানায় শুয়েই দিন কাটছে তার।
সংসারের জীবিকার তাগিদে বড় মেয়ে সুরাইয়া আক্তার এমএ পাশ করে মা ও অন্য ভাই-বোনদের নিয়ে পার্শ্ববর্তী বগুড়ার দুপচাঁচিয়া শহরে ফুচকা বিক্রি শুরু করেন। আর পঙ্গু সালাম নিজের টিনশেড মাটির বাড়ির খোলা বারান্দার মেঝেতে বড় ছেলে মোস্তাকিমের তত্ত্বাবধানে থাকতেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রথম দিকে ছেলে মোস্তাকিম ভালো আচরণ করলেও দিন দিন তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন এবং বাবার ওপর চড়াও হন। নেশার টাকার জন্য পঙ্গু বাবাকে প্রায়ই মারধর, গালিগালাজ ও হত্যার হুমকি দিতেন তিনি। গত কয়েকদিন ধরে মোস্তাকিমের রহস্যজনক আচরণে বাবা সালামের সন্দেহ হয়। মোস্তাকিম একা একা ঘরের ভেতর বালতি হাতে যাতায়াত করতেন এবং পরিশ্রান্ত হয়ে বের হতেন।
বুধবার দুপুরের দিকে সালাম তার চাচাতো ভাই রাজুকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে ডেকে ঘরটি খুলে দেখার অনুরোধ করেন। রাজু ঘরের দরজা খুলে ভেতরে এক কোণে প্রায় ৫ ফুট প্রস্থ ও ৭ ফুট গভীর এক বিশাল গর্ত দেখতে পান। একই সঙ্গে পুরো ঘরজুড়ে বেশ কয়েকটি মাটির বস্তা ও অন্য ঘরের মেঝেতে কাদা-মাটির স্তূপ দেখতে পেয়ে তাদের সন্দেহ হয়। পঙ্গু বাবা সালামও কান্নাজড়িত কণ্ঠে দাবি করেন, তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার জন্যই এই গর্ত খোঁড়া হয়েছে।
ঘটনাটি জানাজানি হলে গ্রামবাসীরা এসে মোস্তাকিমকে আটক করে বেঁধে রাখেন। পরে মোস্তাকিমকে মাদকাসক্ত দাবি করে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার মা ও বড় বোন তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে গা ঢাকা দেন।
প্রত্যক্ষদর্শী রাজু আহমেদ বলেন, মোস্তাকিম তার বাবাকে গোপনে ঘরের ভেতর পুঁতে রাখার জন্যই এই গর্ত খুঁড়েছে। কাঁদা পর্যন্ত প্রস্তুত করে রেখেছিল। তার বাবা পঙ্গু ও পরিবারের বোঝা হয়ে যাওয়ায় তারা এই নির্মম পথ বেছে নিতে চেয়েছিল।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মোস্তাকিমের বড় বোন সুরাইয়া বেগম যুগান্তরকে বলেন, আমার ভাই নেশাগ্রস্ত ঠিকই, তবে বাবাকে হত্যার জন্য গর্ত খোঁড়ার বিষয়টি সঠিক নয়। এর পেছনে অন্য কারণ থাকতে পারে। আমরা থানায় লিখিত অভিযোগ দেব, প্রশাসন তদন্ত করলেই সত্য বেরিয়ে আসবে।
মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত পঙ্গু বাবা আব্দুস সালাম আক্ষেপ করে বলেন, মাটিচাপা দিয়ে মারার জন্যই আমার ছেলে গোপনে গর্ত খুঁড়েছিল। নুন থেকে পান খসলেই আমাকে মারতে আসত। আমি আর বাঁচতে চাই না। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের চিকিৎসার জন্য সম্পদ পর্যন্ত বিক্রি করিনি। আজ আমার স্ত্রী-সন্তান সবাই খারাপ ব্যবহার করছে। আমি আমার জীবনের নিরাপত্তা চাই।
এ বিষয়ে ক্ষেতলাল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুহ. আব্দুল করিম জানান, বিষয়টি লোকমুখে শুনেছি। তবে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: