গোমা সেতু উদ্বোধন: আড়ালে থাকা ‘অদেখা নির্মাতা’—উন্নয়ন রাজনীতির এক নীরব বাস্তবতা
নজরুল ইসলাম আলীম:
বাকেরগঞ্জ উপজেলার মানুষের বহুদিনের প্রত্যাশার প্রতীক গোমা সেতু আজ যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই সেতুর উদ্বোধন ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রত্যাশায় সাধারণ মানুষ উচ্ছ্বসিত।
কিন্তু এই আনন্দ-উল্লাসের মাঝেই একটি প্রশ্ন ধীরে ধীরে সামনে আসছে—এই সেতুর প্রকৃত রূপকার কে? স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, যিনি দীর্ঘদিন ধরে এ সেতু নির্মাণের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন, সেই মানুষটির নাম সরকারি আলোচনায় বা আনুষ্ঠানিক মঞ্চে উচ্চারিত হচ্ছে না।স্থানীয় সূত্র এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, দাড়িয়াল ইউনিয়নের সন্তান মো: মহসিন—যিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতা—এই সেতু নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যদিও তিনি কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নন, তবুও বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন।সম্প্রতি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর-এর এক ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় স্বীকার করেন, গোমা সেতু এবং নির্মাণাধীন নেহালগঞ্জ সেতু বাস্তবায়নে মো: মহসিনের প্রচেষ্টা ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে এ স্বীকৃতি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি।স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিভাজন এবং দলীয় বিবেচনার কারণে মো: মহসিনের নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণ করতে অনেকে অনিচ্ছুক। এমনকি সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে জানা গেছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—উন্নয়ন প্রকল্পে অবদান রাখা ব্যক্তিদের মূল্যায়ন কি শুধুই রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল?বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন রাজনীতিতে এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায়শই দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের পেছনে যাদের ভূমিকা থাকে, তারা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন; বরং কৃতিত্ব পায় ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর নিকটবর্তী ব্যক্তিরা।গোমা সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। পাশাপাশি নির্মাণাধীন নেহালগঞ্জ সেতু এবং বরিশাল-বাউফল সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করে তুলবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এই সেতুগুলোর মাধ্যমে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে, সময় ও খরচ কমবে, এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। শিক্ষার্থী ও রোগীদের জন্যও যাতায়াত হবে দ্রুত ও নিরাপদ।মো: মহসিনের উদাহরণ একটি ভিন্ন বাস্তবতা সামনে আনে—নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না হয়েও উন্নয়নমূলক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব। তার প্রচেষ্টা দেখায়, ব্যক্তি উদ্যোগ, যোগাযোগ দক্ষতা এবং প্রশাসনিক সমন্বয় থাকলে স্থানীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা যায়।তবে একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তোলে—এই ধরনের অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে? উন্নয়ন কি কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের মাধ্যমে স্বীকৃতি পাবে, নাকি প্রকৃত অবদানকারীদেরও যথাযথ সম্মান দেওয়া হবে?
গোমা সেতুর উদ্বোধন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু এর আড়ালে থাকা গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উন্নয়নের দৃশ্যমান কাঠামোর পেছনে অনেক অদৃশ্য হাত কাজ করে। সেই হাতগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু ন্যায্যতাই নয়, বরং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্যও জরুরি।এই সেতু যেমন মানুষের জীবন সহজ করবে, তেমনি হয়তো একদিন উন্নয়ন রাজনীতির স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের দিকেও একটি নতুন সেতু তৈরি করবে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: