মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প: প্রকাশ্যে ডেকে বিক্রি হয় মাদক
মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে থেকে জেনেভা ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে পূর্ব মাথা হয়ে বের হলেই চৌরাস্তার মোড়। মোড়টির উত্তরমুখী সড়কের বাঁয়ে জেনেভা ক্যাম্প, ডানে হুমায়ুন রোড।
ওই সড়ক ধরে উত্তর দিকে এগোতেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক চিত্র।
গত বুধবার দুপুর ১টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, হুমায়ুন রোড হয়ে ক্যাম্পের পূর্ব পাশের চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছানোর পর এক তরুণ এগিয়ে এসে এই প্রতিবেদকের উদ্দেশে বলেন, ‘ভাই, লাল লাগবে?’ কী বোঝাতে চাইছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইয়াবা’। না বললেও ওই তরুণ বারবার প্রস্তাব দিতে থাকেন। পরে গাঁজা কেনার আগ্রহ দেখালে সামনে অবস্থান করা কজন তরুণকে দেখিয়ে দেন।
সেখান থেকে ১৫ কদম এগোতেই ১২ থেকে ১৫ জন তরুণ এই প্রতিবেদককে ঘিরে ধরে। তাদের কয়েকজনের হাতে ছোট প্লাস্টিকের জিপারে মোড়ানো ট্যাবলেটসদৃশ বস্তু। যেটাকে তারা ইয়াবা বলে পরিচয় দেয়। কেউ কেউ প্যাকেট খুলে ঘ্রাণ নেওয়ারও প্রস্তাব দেয়।
নিজেদের পণ্যের নানা বর্ণনা দিয়ে কিনতে উৎসাহিত করতে থাকে।
দাম জানতে চাইলে তারা জানায়, প্রতি পিস ইয়াবা ২৫০ টাকা। গাঁজার পুরিয়া ৫০ টাকা। কথা হয় ‘চিকা’ নামের এক কারবারির সঙ্গে। তাঁর কাছে হেরোইন আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি তো হেরোইনের গোডাউনে দাঁড়িয়ে আছেন।
কত কেজি লাগবে?’ পুরিয়ার দাম জানতে চাইলে তিনি জানান, ২০০ টাকা।
ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনের পাশাপাশি সেখানে বাংলা মদও পাওয়া যায় বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, ক্যাম্পে দেড় হাজার টাকা লিটারে বাংলা মদ বিক্রি হয় এবং চাইলে ভেতরে বসে সেবনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
ওই সময় দেখা যায়, একের পর এক ব্যক্তি এসে নিজেদের চাহিদা মতো মাদক সংগ্রহ করছেন। লেনদেন শেষ হতে সময় লাগে কয়েক সেকেন্ড। এই ক্রেতাদের বড় একটি অংশ রিকশাচালক। ওখান থেকে বের হওয়ার সময় নাদিম নামে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি বলেন, ‘শুনেন, এহানে নেশা কিনতে আইবেন, অন্য কামে আইলে ছিনতাই হইয়া যাইবেন। সাবধান।’ সেখান থেকে ১৫ কদম এগোতেই ফের কয়েকজন কারবারি গাঁজা কেনার প্রস্তাব দেন। তাঁদের সরিয়ে আরেকজন এসে বলেন, ‘ভাই, লাল লাগবো? সেই পিনিক। একটা খাইলেও সাই সাই।’ ওখানেও ১২ থেকে ১৫ জন মাদক বিক্রি করছিলেন।
উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে আরো কয়েকটি স্থানে একই ধরনের মাদক কারবারের দৃশ্য দেখা যায়। এই কারবারিদের বড় অংশ তরুণ ও যুবক। সব মিলিয়ে ওই রাস্তায় অন্তত ৫০ জন মাদক কারবারি ছিলেন।
এক পর্যায়ে রাস্তার মাথায় পুলিশের দুটি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেল দেখা গেলেও সেখানে কোনো পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়নি। এর পর জেনেভা ক্যাম্পের উত্তর পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে শুরু করলে সেখানেও সাত থেকে আটজন মাদক কারবারিকে দেখা যায়। তাঁরাও কাছে এসে মাদক কেনার প্রস্তাব দেন। এদিকে জেনেভা ক্যাম্পের পূর্ব পাশের বাজারের রাস্তা ধরে হাঁটতে গিয়ে বাজারের ভেতরেও মাদক কারবারিদের দেখা গেছে। সব শেষ জেনেভা ক্যাম্পের ভেতরে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে সড়ক ধরে এগোলে ওখানেও ইয়াবা ও হেরোইনের কারবারিদের দেখা গেছে। সব মিলিয়ে জেনেভা ক্যাম্পের চারদিক ঘিরে অন্তত ৭০ জন মাদক কারবারি মাদক কারবার করছেন। তবে ক্যাম্পের আশপাশের রাস্তাগুলো ঘুরে কোথাও পুলিশ সদস্যদের চোখে পড়েনি।
জেনেভা ক্যাম্পের পাশের সড়কগুলোয় বেপরোয়া মাদক কারবার নিয়ে অতিষ্ঠ আশপাশের বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, নিয়মিত ওই এলাকায় ছিনতাই ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশকে জানিয়েও জেনেভা ক্যাম্পের মাদক কারবারিদের হাত থেকে পরিত্রাণ মিলছে না। তবে স্থানীয়রা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চান না ভয়ে।
মাদকের রমরমা কারবারের বিষয়ে পুলিশের ভূমিকার বিষয়ে প্রশ্ন করলে মোহাম্মদপুর থানার ওসি মেসবাহ উদ্দিন পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘আপনি কখন সেখানে গিয়েছিলেন?’ বুধবার দুপুর ১টায় যাওয়ার তথ্য জানালে তিনি বলেন, ‘বিকেল ৪টা থেকে জেনেভা ক্যাম্পের আশপাশে সাতটা চেকপোস্ট বসে। ওই সময় হয়তো পুলিশ ছিল না। আমরা চেষ্টা করছি।’ তবে একাধিক দিন একাধিক সময়ে এই এলাকায় গিয়েও একই চিত্র দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে মাদকসহ নানা অপরাধের যে অরণ্য তৈরি হয়েছে, সেটা এক দিনে তৈরি হয়নি। এখানের অপরাধের সুবিধাভোগী অনেক। তাদেরও বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। জেনেভা ক্যাম্পে আমরা যে ধরনের অভিযান দেখতে পাই, এটা আসলে লোক দেখানো। থানা পুলিশের পক্ষে জেনেভা ক্যাম্পকে অপরাধমুক্ত করা সম্ভব না। বিশেষ ইউনিট দিয়ে অভিযান চালাতে হবে। অভিযানের সময় গণমাধ্যমকেও জানানো যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্পকে অপরাধমুক্ত করার পাশাপাশি ক্যাম্পের বাসিন্দাদের প্রশ্ন—রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত কী হবে, এই জায়গাতেও আমরা একটা ঝুলন্ত অবস্থায় আছি। এটাও সমাধান করা প্রয়োজন। আপনি যখন কাউকে মানবাধিকার বা নাগরিকের অধিকার থেকে বিরত রাখবেন, তখন তাঁরা জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে আইন বিরুদ্ধ কাজগুলোর দিকে ধাবিত হয়।’
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: