আদায় হচ্ছে না পাচার হওয়া ঋণের অর্থ, ব্যাংক খাতে মূলধন ও আয় ঋণাত্মক
জালিয়াতির ও পাচার করা ঋণের টাকা আদায় করা যাচ্ছে না। ব্যাংকগুলো থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে কোনো নিয়মনীতি না মেনে ঋণ বিতরণ করা এবং ওইসব ঋণের বিপরীতে তদারকি না করায় খেলাপি ঋণ মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে গেছে। এগুলোর বিপরীতে কোনো আয়ও হচ্ছে না ব্যাংকগুলোর। এতে একদিকে ব্যাংকগুলোর আয় কমেছে। অন্যদিকে ওইসব ঋণ এখন সবই খেলাপি হচ্ছে।
খেলাপির হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি বেড়ে এখন ঋণাত্মক হয়ে গেছে। খেলাপি ঋণের পেটে চলে গেছে মূলধন। একই সঙ্গে আয় কমে গিয়ে ব্যাংক খাত লোকসানে পতিত হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এতে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এতে উদ্যোক্তাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমেছে। ফলে সেগুলো খেলাপি হয়ে ব্যাংকের সম্পদের মান কমে গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বাড়ায় সম্পদের গুণগত মান বহুলাংশে কমে গেছে। মূলত ব্যাংকগুলো জালিয়াতির মাধ্যমে যেসব ঋণ বিতরণ করেছে সেগুলোর বিপরীতে যথেষ্ট তদারকিও ছিল না। একই সঙ্গে এসব ঋণ আদায়ের তৎপরতাও ছিল না। যে কারণে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ইউনিটের পাশাপাশি অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকেও জালিয়াতি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ইউনিট থেকে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে টাকায়। এতে আমানতাকারীদের অর্থ তছরুপ হয়েছে। অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে ঋণ দেওয়া হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রায়। এসব ঋণের অংশই বিদেশ থেকে আমানত বা ঋণ হিসাবে নেওয়া। এসব ঋণের অর্থ আদায় না হওয়ায় এখন বৈদেশিক দায় যেমন বেড়েছে, তেমনি বৈদেশিক খাতে বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান খারাপ হওয়ায় ও আয় কমে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের হার কমতে কমতে ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। ২০২৪ সালের ব্যাংক খাতে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন ছিল ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। গত বছরের শেষে তা কমে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ গড় হিসাবে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে কোনো মূলধন নেই। বরং তা ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। অথচ মূলধন থাকার কথা কমপক্ষে ১০ শতাংশ। বাড়তি ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য সাড়ে ১২ শতাংশ মূলধন থাকার কথা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি খাতে বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেশি হওয়ায় তাদের মূলধন ঘাটতিও বেড়েছে বেশি মাত্রায়। এসব ব্যাংকের কারণে সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতের মূলধন চলে গেছে খেলাপি ঋণের পেটে। তবে ডজনখানেক ব্যাংক এখনো ভালোভাবে চলছে। এদের আর্থিক ভিত্তিও শক্তিশালী।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, যেসব ব্যাংকে জালিয়াতি বেশি হয়েছে ওইসব ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বেশি। যে কারণে খেলাপি ঋণের ৫২ শতাংশই রয়েছে ৫টি ব্যাংকে। বাকি ৮৮ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে ৫৭টি ব্যাংকে। ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোতে থাকা জামানতের পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে। বেশির ভাগ ঋণের বিপরীতে কোনো জামানত নেই। যে কারণে সম্পদের মান আরও কমেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর দায়ের পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে সম্পদ বাড়ার হার কমেছে। যে কারণে ব্যাংকগুলোর সার্বিকভাবে ঝুঁকির প্রবণতাও বেড়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকগুলোর আয়ও কমে ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের
ব্যাংকগুলোর সম্পদ থেকে আয় হয়েছিল দশমিক ৪৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে এ খাতে কোনো আয় হয়নি। উলটো আয় ঋণাত্মক ৪ দশমকি ৪১ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ সম্পদ থেকে ব্যাংকগুলোর লোকসান হয়েছে। একইভাবে মূলধন থেকে ২০২৪ সালে ব্যাংকগুলোর আয় হয়েছিল ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। ২০২৫ সালে এ খাত থেকে কোনো আয় হয়নি। উলটো আয় ঋণাত্মক হয়েছে ২৪৩ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ মূলধন থেকেও লোকসান হয়েছে। কারণ ব্যাংকগুলোর মূলধন না থাকায় তা বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না। ফলে আয়ও হচ্ছে না। উলটো ব্যবস্থাপনা খাতে খরচ হচ্ছে। এতে লোকসান বেড়েছে।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: