ওসি পল্লবীর জনহয়রানির ফাঁদ, পুলিশ-প্রতারকের রফাদফায় ভুক্তভোগীরা আটক!
আহসান হাবিব। প্রতারণাই যার স্বভাব। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খাদ্যপণ্য সাপ্লাই ব্যবসার মাধ্যমে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে হয়ে যান লাপাত্তা। নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে কারও কাছ থেকে এক কোটি টাকা নিতে পারলেই কেল্লাফতে। এরপর ৩০ লাখ টাকা খরচ করেন পুলিশ ও আইনজীবীদের পেছনে। উদ্দেশ্য-পাওনাদারের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে পুলিশ ও আইনজীবীদের সহায়তা নিয়ে হয়রানি করা। গ্রেফতার করে কারাগারে আটকে রাখা। যাতে নির্বিঘ্নে টাকা আত্মসাৎ করা যায়। প্রথমে পুলিশের সঙ্গে সমঝোতা করে সেই মামলায় ভুক্তভোগীদেরই গ্রেফতার করানো হয়। এরপর শুরু হয় টানা হয়রানি-পর্ব। এমনই এক ভয়ংকর প্রতারক এই আহসান হাবিব। পল্লবী থানা পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশ করে শনিবার বিকালে এরকম হয়রানিমূলক গ্রেফতারের পথ বেছে নেয় এই প্রতারকচক্র।
জানা যায়, এই প্রতারক কয়েকজন পাওনাদারকে টাকা পরিশোধের কথা বলে শনিবার বিকালে ডেকে নিয়ে যান রাজধানীর ইসিবি চত্বরে। এরপর যথারীতি পরিকল্পনা অনুযায়ী সাজানো অপহরণ মামলায় পল্লবী থানা পুলিশ দিয়ে ভুক্তভোগীদের কয়েকজনকে আটক করানো হয়। তাৎক্ষণিকভাবে পল্লবী থানার ওসিসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। তা সত্ত্বেও ভুক্তভোগীদের থানায় নিয়ে আটকে রাখা হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রাত সাড়ে ৯টায় ভুক্তভোগীদের ছাড়া হয়নি।
ভুক্তভোগীদের আটকের বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট এসআই সাইফুলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে ডিএমপির পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির যুগান্তরকে বলেন, ‘ভাই, আমি বুঝতে পারছি ওনারা (আটক তিনজন) প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ওনাদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাটিও সঠিক নয়। আমি মামলার ফাইনাল রিপোর্ট (চূড়ান্ত প্রতিবেদন) দিয়ে দেব। তবে যেহেতু মামলা হয়েছে, সেহেতু আমি আটক ব্যক্তিদের গ্রেফতার দেখাব।’ মিথ্যা মামলা হলেই কোনো ধরনের অনুসন্ধান ছাড়া গ্রেফতার করা যায় কিনা, জানতে চাইলে ওসি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। বিষয়টি বিস্তারিত জানার জন্য আমি পল্লবী থানায় যাচ্ছি।’
সূত্র জানায়, বেলা ২টার দিকে আট ভুক্তভোগীর মধ্যে রোমেল নামে এক ব্যক্তিকে আহসান হাবিবের স্ত্রী ফোনে কল করে বলেন, আপনাদের টাকাটা ধীরে ধীরে দিয়ে দেব। আজ ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি অংশ ফেরত দেওয়া ছাড়াও যে আপাকে টাকা দেওয়ার পরিবর্তে জমি লিখে দিয়েছি, সেটাও বিক্রি করে দেব। একজন ভালো কাস্টমার পাইছি। আপনারা ইসিবি চত্বরে ৩টার সময় আসেন। এ কথা বিশ্বাস করে রুমেল তার স্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট আরও একজন ভুক্তভোগীকে বিষয়টি জানান। এরপর তারা তিনজন সেখানে যান। কিন্তু যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ইসবি চত্বরে আহসান হাবিব স্ত্রীসহ আসার কথা বললেও তখনও আসেননি। বৃষ্টির জন্য পথে আটকা পড়েছেন বলে সময়ক্ষেপণ করেন। একপর্যায়ে তাদের সামনে এসে হাজির হয় পল্লবী থানা পুলিশের একটি টিম। এসআই সাইফুলের নেতৃত্বে পুলিশের টিম তাদের ওয়ারেন্ট আছে বলে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
সূত্র জানায়, এই আটক নাটকের আগে আসামি আহসান হাবিবকে নিয়ে থানার ভেতরে একাধিক বৈঠকও করেন পল্লবী থানার ওসি। পল্লবী থানায় মাত্র দুই মাস হলো তার পোস্টিং হয়েছে। আর এর মধ্যেই তিনি নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
আটকের সময় ভুক্তভোগীরা যুগান্তরকে জানান, তারা আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলাও করেছেন। এর মধ্যে একটিতে আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে চার্জশিটও হয়েছে।
এদিকে আটকের পর ভুক্তভোগীরা জানতে পারেন, প্রতারক আহসান হাবিব তাদের বিরুদ্ধে ১৫ জুলাই পল্লবী থানায় একটি অপহরণ মামলা করেছেন। তবে কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা নেই ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে।
সূত্র বলছে, প্রতারক আহসান হাবিব সম্প্রতি ৮ ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ১৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন।
আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে ডিএমপির গুলশান থানা (এফআইআর নং-২, তারিখ: ৬ এপ্রিল, ২০২৩; জিআর নং-৮৩), চট্টগ্রামের পটিয়া যুগ্ম দায়রা জজ আদালত (মামলা নং-৫৪৩৩৯, সিআর নং-৪০৯/২২, তারিখ: ৩ ডিসেম্বর ২০২৪), রাজশাহী মহানগর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৫ (সিআর নং-১০৪/২৫, তারিখ: ১ ডিসেম্বর, ২০২৫), ঢাকার বিজ্ঞ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালত-৬ (সিআর নং-১৫১/২১, তারিখ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫) এবং সাভারের বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নং-০২ (সিআর নং-১১৮৬/২৫, তারিখ: ২ মার্চ ২০২৬)-সহ বেশকিছু মামলা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি রয়েছে। প্রতারক আহসান হাবিবের বাবার নাম হাতেম আলী। বাড়ি পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার পাইকরহাটি পশ্চিমপাড়া গ্রামে। এছাড়া তার বর্তমান ঠিকানা সাভারের রামনগরে। যদিও এই প্রতারক একাধিক ঠিকানা ব্যবহার করেন।
সূত্র জানায়, আত্মগোপনে থাকা এই আহসান হাবিবকে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় এক সপ্তাহ আগে মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ভুক্তভোগীরা ধরতে সক্ষম হন। থানায় নিয়ে তার বিরুদ্ধে থাকা গ্রেফতারি পরোয়ানা পুলিশকে দেখানোর পর পুলিশ সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ না করে রহস্যজনক কারণে সালিশ করে। পুলিশের একজন এসআই প্রথমে প্রতারক আহসান হাবিবের সঙ্গে আলাদা কথা বলার নাম করে ১০ মিনিট আলাপ করেন। এরপর তিনি বেরিয়ে এসে বলেন, সাতদিনের মধ্যে আহসান পাওনাদারদের সব টাকা বুঝিয়ে দেবে। এভাবে আশ্বাস দিয়ে একজন ব্যক্তির জিম্মায় দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সে অনুযায়ী টাকা না দিয়ে গোপনে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে এভাবে হয়রানির পথ বেছে নেন। যার অন্যতম সহযোগী এখন পুলিশের কতিপয় দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা। এছাড়া নৌবাহিনীর একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পেছন থেকে ইন্ধন দিচ্ছেন। যিনি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর উপদেষ্টা হিসাবে প্রতারক আহসান হাবিবের কথিত সাপ্লাই ব্যবসায় অফিশিয়ালি যুক্ত হন। মূলত বেশির ভাগ ভুক্তভোগী এই কর্মকর্তাকে দেখেই অর্থ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়।
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ যুগান্তরকে বলেন, মামলা দুই ধরনের, একটা কগনিজেবল (আমলযোগ্য) এবং আরেকটি নন-কগনিজেবল (আমল অযোগ্য)। কগনিজেবল অফেন্স হলে পুলিশের দায়িত্ব এফআইআর রেজিস্টার হওয়ার আগে তদন্ত করে দেখা ঘটনাটি সঠিক কিনা।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: