সাড়ে সাত বছরে ৭৯ পুলিশ সদস্যের আত্মহত্যা
বাংলাদেশ পুলিশের নিম্নপদস্থ সদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সাড়ে সাত বছরে পুলিশের ৭৯ জন সদস্য আত্মহত্যা করেছেন।
অর্থাৎ বছরে গড়ে ১০ জনের বেশি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁদের বড় অংশই কনস্টেবল ও এএসআই পদমর্যাদার।
সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার ভোররাতে রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইনসের একটি ভবনে সাইদুল ইসলাম (২১) নামের কনস্টেবল আত্মহত্যা করেছেন। এ ঘটনার প্রায় ১৬ ঘণ্টা আগে নিজের ফেসবুক আইডিতে স্ত্রীকে নিয়ে পুরনো কিছু ছবি সংযুক্ত করে একটি ভিডিও পোস্ট করেন তিনি।
সেখানে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে মানসিক যন্ত্রণা, হৃদয়ভঙ্গ এবং হতাশার কথা প্রকাশ পায়। এ নিয়ে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৯ জন পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন।
বছরভিত্তিক চিত্র
বছরভিত্তিক হিসাব বলছে, ২০১৯ সালে আত্মহত্যা করেন ১৩ জন পুলিশ সদস্য। ২০২০ সালে ১০, ২০২১ সালে ১১, ২০২২ সালে ছয়, ২০২৩ সালে ১৩, ২০২৪ সালে তিন এবং ২০২৫ সালে আবার বেড়ে ১৪ জনে পৌঁছায়।
চলতি বছরের এ পর্যন্ত ৯ জনের আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে।
আত্মহত্যার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ সদস্যই পারিবারিক ও চাকরিজীবনের নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ, কেউ পারিবারিক কলহে বিপর্যস্ত, আবার অনেকে বদলি ও পদায়ন নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন। দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকা, ছুটি না পাওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার হতাশাও তাঁদের ছিল।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা সাধারণত একটিমাত্র কারণে ঘটে না।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ঘুমের ঘাটতি, পারিবারিক টানাপোড়েন, আর্থিক সংকট, কর্মস্থলের চাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অনীহা—এসব কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
কেন গুরুত্ব পাচ্ছে এই পরিসংখ্যান?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের সদস্যদের মানসিক সুস্থতা কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি জননিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। দীর্ঘ সময়ের ডিউটি, ছুটির সীমাবদ্ধতা, উচ্চ ঝুঁকির কাজ এবং ট্রমার অভিজ্ঞতা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই শুধু ঘটনা-পরবর্তী তদন্ত নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, গোপনীয় কাউন্সেলিং, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
যেসব কারণে হতাশা বাড়ছে
কনস্টেবল ও এএসআই কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা বলছে, এই পেশা মানবিক সীমার অনেক বাইরে গিয়ে তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ১২ ঘণ্টার ডিউটি প্রায়ই বিরতি ছাড়াই ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টায় ঠেকে। অপ্রতুল বেতন ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে ব্যারাকগুলো এতটাই জনাকীর্ণ যে একটি কক্ষে অনেক সদস্যকে একসঙ্গে থাকতে হয়। যেখানে স্যানিটেশনব্যবস্থাও অত্যন্ত নিম্নমানের। এমন পরিস্থিতি তাঁদের মনোবল ও আত্মমর্যাদা ক্ষয় করে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেকেই চাকরি পেতে ঘুষ বা অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে ঋণের বোঝা নিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন, যা শুরু থেকেই তাঁদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে এবং পুরো কর্মজীবনে সেই চাপ বহন করতে হয়। যখন বাহিনীর সবচেয়ে নিম্নপদস্থ সদস্যরা আর্থিক দায়ের ভার নিয়ে চাকরি শুরু করেন এবং এরপর অবিরাম কর্মচাপ ও অমানবিক জীবন যাপনের মুখোমুখি হন, তখন তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
দুই লাখ সদস্য, নেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
বর্তমানে পুলিশে দুই লাখ ১৫ হাজারের বেশি সদস্য কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের চিকিৎসাসেবার জন্য ঢাকার রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল রয়েছে। সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ থাকলেও স্থায়ী কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দিয়ে সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের ৫৯টি জেলায় পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা সুবিধা থাকলেও কোথাও পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেই।
রাজধানীর অ্যাথেনা মানসিক ও মাদকাসক্তি কেন্দ্রের সাইকোথেরাপিস্ট নুসরাত সাবরিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, পুলিশ সদস্যদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিশ্চয়তা, পেশাগত ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব ও পারিবারিক জীবন—এসবের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা এবং বিভিন্ন সময় পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা প্রায় নিত্যসঙ্গী। এসব চাপ দীর্ঘ মেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। সময়মতো সহায়তা না পেলে তা বিষণ্নতা, স্ট্রেস, বার্নআউট, উদ্বেগ, ট্রমা এমনকি আত্মহত্যার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে পুলিশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি মৌলিক ও অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
রাজধানীতে কর্মরত একজন পুলিশ সদস্য বলেন, ছোট চাকরি, বেতন কম; কিন্তু পরিবারের চাহিদা বেশি। ফলে মানসিক চাপ পরিবারের দিক থেকেও আসে। অনেকে সেই চাপ সামলাতে পারেন না। অথচ তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং ব্যবস্থাও নেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, আত্মহত্যার পরিসংখ্যানে মাঠ পর্যায়ের সদস্যসংখ্যা বেশি। কারো মধ্যে এ প্রবণতা দেখা দিলে প্রাথমিকভাবে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক বলেন, এই সমস্যা মোকাবেলায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো, যেখানে বাধ্যতামূলক মানসিক কাউন্সেলিং, চাপ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ, গোপনীয় অভিযোগ ও সহায়তা ব্যবস্থা এবং একই সঙ্গে বেতন, আবাসন ও কর্মপরিবেশের বাস্তবসম্মত উন্নয়ন।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: