বাজেটে ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকা, জমা পড়েছে ৩০৪ ছাঁটাই প্রস্তাব
জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত ও সম্পূরক বাজেট উপস্থাপন করেছে সরকার। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা, সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং অপচয় কমানোর লক্ষ্য সামনে রেখে এ বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। সংশোধিত বাজেটে সরকারের ব্যয় কিছুটা কমানো হলেও সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা। একই সঙ্গে বাজেটের বিভিন্ন খাত নিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ৩০৪টি ছাঁটাই প্রস্তাব জমা দিয়েছেন।
সোমবার (১৫ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সপ্তম কার্যদিবসে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংশোধিত ও সম্পূরক বাজেট উপস্থাপন করেন। বাজেট বক্তব্যে তিনি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা এবং ঘাটতি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকারের নিট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। তবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নের গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকায় ব্যয় কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। এর ফলে সংশোধিত বাজেটে মোট সরকারি ব্যয় ২ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সংশোধিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশের সমান। সরকারের মতে, বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই ঘাটতি নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে কাজ করছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মধ্য দিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মিতব্যয়িতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অগ্রাধিকারহীন ব্যয় সংকোচন, প্রশাসনিক ব্যয় কমানো এবং অপচয় রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলোও অব্যাহত রাখা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, কৃষক কার্ড সুবিধা এবং ইমাম, পুরোহিত ও মুয়াজ্জিনদের জন্য সম্মানী ভাতা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হয়েছে, যা সম্পূরক বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে।
বাজেট উপস্থাপনের পর সংসদের কার্যসূচি অনুযায়ী মঞ্জুরি দাবিগুলোর ওপর আলোচনা ও ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, সংবিধানের বিধান অনুযায়ী দায়যুক্ত ব্যয় নিয়ে আলোচনা করা গেলেও সেসব ব্যয় ভোটাভুটির আওতায় আসে না।
স্পিকার বলেন, এবারের সম্পূরক বাজেটে মোট ২৫টি মঞ্জুরি দাবি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব দাবির বিপরীতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ব্যাপক সংখ্যক ছাঁটাই প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। বেগম রুমিন ফারহানা, শাহজাহান চৌধুরীসহ বিরোধী দলের ২০ জন সদস্য মোট ৩০৪টি ছাঁটাই প্রস্তাবের নোটিশ দিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, সংসদের নির্ধারিত সময় বিবেচনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওপর আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে অর্থ বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সম্পর্কিত খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নির্ধারিত এসব খাতের ওপর সংসদ সদস্যরা তাদের ছাঁটাই প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন এবং আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অন্যদিকে, তালিকার বাইরে থাকা মঞ্জুরি দাবিগুলো সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক ব্যয় অব্যাহত রাখা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সংসদে উপস্থাপিত সংশোধিত বাজেট সেই ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: