আজ আষাঢ়ের প্রথম দিন
কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভাষা ধার করে বলা যায়, এই ‘মনোরম মনোটনাস’ শহরে আবারও এসেছে সুন্দর বৃষ্টির দিন। গাছের পাতায়, ছাদের রেলিংয়ে, জানালার কাচে কিংবা দূর দিগন্তের খোলা প্রান্তরে ঝমঝমিয়ে ঝরে পড়বে অঝোর ধারার সুরেলা সংগীত।
ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে, মেঘের গর্জনে আর বৃষ্টির ছন্দে প্রকৃতি ফিরে পাবে তার আপন প্রাণ। আজ সোমবার, আষাঢ়ের প্রথম দিন। শুরু হলো বর্ষা ঋতু। আষাঢ়, তোমায় স্বাগত।
বাংলার ছয় ঋতুর মধ্যে বর্ষার আবেদন ভিন্নধর্মী। গ্রীষ্মের তাপদাহ ও রুক্ষতার পর বর্ষা প্রকৃতির বুকে নিয়ে আসে নতুন প্রাণের স্পন্দন। আকাশজুড়ে জমে ওঠা কালো মেঘ, দূরে মেঘের গর্জন, ঝুম বৃষ্টির শব্দ আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ যেন নতুন করে অনুভব করতে শেখায় জীবন ও প্রকৃতি।
বর্ষাকাল বাংলার প্রকৃতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টিতে তপ্ত মাটি ফিরে পায় সজীবতা। শুকিয়ে যাওয়া গাছপালা সবুজ হয়ে ওঠে, নদী-খাল-বিল ভরে ওঠে পানিতে। কৃষকের মাঠে জাগে নতুন আশার আলো। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জীবনের সঙ্গে বর্ষার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
বর্ষা বাঙালির সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পকলারও চিরন্তন অনুষঙ্গ।
কদম ফুল, মেঘলা আকাশ, নদীর উচ্ছ্বাস, ব্যাঙের ডাক কিংবা বৃষ্টিভেজা বিকেল—সব মিলিয়ে বর্ষা হয়ে ওঠে আবেগময় এক অনন্য অনুভূতি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, জসীমউদ্দীনসহ বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব বড় কবি-সাহিত্যিক তাঁদের সৃষ্টিতে বর্ষাকে নানা রূপে তুলে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গান বৃষ্টির দিনে বাঙালির মনকে আলোড়িত করবেই।
বর্ষা শুধু আনন্দের নয়, কিছু বিড়ম্বনাও নিয়ে আসে জীবনে ও প্রকৃতিতে। বিশেষ করে নগরজীবনে। রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোয় ভারি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, যানজট ও ভোগান্তি বেড়ে যায়। আর অতি বৃষ্টি নিয়ে আসে বন্যা, নদীভাঙনের মতো বিপর্যয়।
সবকিছুর পরও বর্ষা বাঙালির অন্যতম প্রিয় ঋতু। কারণ এই ঋতু প্রকৃতিকে নতুন জীবন দেয়, মানুষের মনে জাগায় স্বপ্ন ও সৃজনশীলতার নতুন আলো।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্ষাকে বরণ করে নিতে নেওয়া হয়েছে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। গান, কবিতা, আবৃত্তি ও নৃত্যানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে আষাঢ়স্য প্রথম দিন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বর্ষার স্মৃতি, অনুভূতি ও শুভেচ্ছায় মুখর থাকবেন অনেকে।
বর্ষা উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে গত ১৮ বছর ধরে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে ‘বর্ষা উৎসব’ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় এবারও আয়োজিত হচ্ছে ‘বর্ষা উৎসব-১৪৩৩’। আজ সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশের দক্ষিণ পাশের চত্বরে সকাল ৭টা ২০ মিনিটে শিল্পী মো. মিনহাজুল হাসান ইমনের রাগসংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসবের শুভ সূচনা হবে।
‘বর্ষা কথন’ পর্বে সভাপতিত্ব করবেন লেখক, গবেষক ও নৃত্যশিল্পী অধ্যাপক ড. নিগার চৌধুরী। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা আশরাফুল আলম এবং বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেবেন বর্ষা উৎসব উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট।
অন্যদিকে আজ সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে ‘বর্ষা উৎসব-১৪৩৩’। ওস্তাদ জাবীর ইমাম খান শাহী রাগ ‘মিয়া কি মল্লার’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। দিনব্যাপী এ আয়োজনে পরিবেশিত হবে বর্ষার গান, কবিতা ও নৃত্যের নানা পর্ব। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উদীচীর কেন্দ্রীয় সংগীত বিভাগের পাশাপাশি সমবেত সংগীত পরিবেশন করবে উদীচীর উত্তরা ও ডেমরা শাখা।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
- বিষয়:
- আজ* আষাঢ়ের,প্রথম দিন
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: