বিজেপির অন্যরকম ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে’ হারল মমতা
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকল। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে নীল-সাদা প্রাসাদের দখল নিল ভারতীয় জনতা পার্টি। তবে এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সমান্তরালে যে বিষয়টি সবথেকে বেশি চর্চায় উঠে এসেছে, তা হলো নির্বাচন কমিশনের 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (এসআইআর) প্রক্রিয়া। নির্বাচনের ঠিক আগে রাজ্যজুড়ে ৯০ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়া নিয়ে যে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল, ভোটের ফলাফলে তার এক গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
তৃণমূল কংগ্রেস শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছিল যে, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়াটি ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং পক্ষপাতদুষ্ট। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে যেভাবে গণহারে নাম কাটা হয়েছে, তাকে শাসক দল তাদের নির্দিষ্ট ভোটব্যাংককে লক্ষ্য করে চালিত একটি চাল হিসেবেই দেখেছিল। মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন দলটির আশঙ্কা ছিল যে, এই প্রক্রিয়ার ফলে তাদের একটি বড় অংশের জনসমর্থন ভোটের হিসাব থেকে হারিয়ে যাবে। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল বলছে, তৃণমূলের সেই আশঙ্কাই কার্যত বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে এবং এই ভোটার বিয়োজনই তাদের পরাজয়ের অন্যতম অনুঘটক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, যে ১৪৭টি কেন্দ্রে ২৫ হাজারেরও বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তার মধ্যে বিজেপির জয়জয়কার স্পষ্ট। এই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে বিজেপি একাই ৯৫টি আসনে জয়লাভ করেছে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের ঝুলিতে এসেছে মাত্র ৫১টি আসন। শতাংশের হিসেবে দেখা যাচ্ছে যে, যে সমস্ত এলাকায় ভোটার তালিকায় বড় ধরনের রদবদল হয়েছে, সেখানেই বিজেপির জয়ের হার সবথেকে বেশি। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, ভোটার তালিকার শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া আদতে রাজনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
মাঝারি ধরনের নাম বাদ পড়া কেন্দ্রগুলোতেও বিরোধী শিবিরের দাপট লক্ষ্য করার মতো ছিল। যে ৬৭টি আসনে ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজারের মধ্যে ভোটার বিয়োজন হয়েছে, সেখানেও বিজেপি ৪৭টি আসন দখল করে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। তৃণমূল সেখানে মাত্র ১৯টি আসনে জয়ী হতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি যেখানে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজারের মধ্যে নাম বাদ গেছে, সেই ৬২টি আসনের মধ্যে ৫০টিতেই বিজেপি জয়ী হয়েছে। অর্থাৎ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার সংখ্যার সাথে সরাসরি বিজেপির জয়ের একটি গাণিতিক যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
মুর্শিদাবাদ জেলার চিত্রটি এবারের নির্বাচনে সবথেকে বেশি চমকপ্রদ ছিল। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস এই জেলায় ২২টির মধ্যে ২০টি আসনেই জয়লাভ করেছিল, যা ছিল তাদের অন্যতম বড় শক্তির জায়গা। কিন্তু এবারের এসআইআর প্রক্রিয়ায় এই জেলাতেই সবথেকে বেশি, প্রায় ৪.৫৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব দেখা গেছে ব্যালট বক্সে, যেখানে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ২০ থেকে নেমে সরাসরি ৯-এ এসে ঠেকেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যালঘু ভোটে ভাঙন এবং হিন্দু ভোটের মেরুকরণ এই পতনের প্রধান কারণ।
একই দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলাতেও। গত নির্বাচনে এই জেলায় তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল এবং তারা ৩৩টির মধ্যে ২৮টি আসনেই জয়ী হয়েছিল। তবে এবারের নির্বাচনে সেই সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে কমে গিয়ে মাত্র ৮-এ দাঁড়িয়েছে। এই জেলায় প্রায় ৩.২৫ লক্ষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন, যার বড় অংশই সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তৃণমূলের এই শক্ত ঘাঁটিতে ফাটল ধরাতে ভোটার তালিকা সংশোধনের ভূমিকা যে অপরিসীম ছিল, তা এখন পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
মালদহ জেলার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে যেখানে ১২টি আসনের মধ্যে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ৮ থেকে কমে ৬-এ দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এই রাজ্যটিতে কথিত অনুপ্রবেশকারী এবং ভুয়া ভোটার চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশন যে বিশেষ অভিযান চালিয়েছিল, তাতে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। গত বছর নভেম্বরে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে খসড়া তালিকা এবং চূড়ান্ত তালিকার মাধ্যমে এত বিশাল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়া হয়, যা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের এই এসআইআর প্রক্রিয়াটিই এবারের বিধানসভা নির্বাচনের ভাগ্যবিধাতা হয়ে দাঁড়াল। নির্বাচন কমিশনের দাবি অনুযায়ী, মৃত এবং দ্বৈত ভোটারদের সরিয়ে তালিকা স্বচ্ছ করার এই পদক্ষেপটি ছিল প্রশাসনিক রুটিন কাজ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রাজ্যে এই প্রশাসনিক পদক্ষেপটিই শেষ পর্যন্ত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা একটি রাজনৈতিক জমানার পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকল। তৃণমূলের দাবি করা 'টার্গেটেড' ভোটার ডিলিশন এবং বিজেপির রাজনৈতিক উত্থান এখন সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে বঙ্গ রাজনীতিতে।
সূত্র: এনডিটিভি
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
- বিষয়:
- বিজেপির* অন্যরকম ,‘ইলেকশন
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: