রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে যেভাবে বদলে দিল
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে সেই অভিযান দ্রুতই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নেয়। চার বছর পেরিয়ে গেলেও সংঘাত থামেনি। এই যুদ্ধ শুধু ইউক্রেন নয়, পুরো ইউরোপের অর্থনীতি, রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।
যুদ্ধের আগে ইউরোপের বহু দেশ রাশিয়ার গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর সরবরাহ কমে গেলে জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। শিল্পনির্ভর দেশগুলো বড় চাপে পড়ে। জার্মানির শিল্পপ্রতিষ্ঠান এস-কে-ডাব্লিউ শ্টিকশ্টফভেরকে পিস্টারিট্স জিএমবিএইচ জানায়, রুশ গ্যাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের উৎপাদন ব্যয় ব্যাপক বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পেত্র সিংর বলেন, এখন লাভ নয়, টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ।
যুদ্ধ ইউক্রেনের অবকাঠামো ও জনজীবনে ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে এনেছে। লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এক কোটির বেশি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭০ লাখ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর ফলে ইউরোপের শ্রমবাজার, সামাজিক কাঠামো ও কল্যাণব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
নিরাপত্তা নীতিতেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। ইউরোপ বুঝতে পেরেছে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা ছাড়া বিকল্প নেই। সামরিক জোট ন্যাটো আবার সক্রিয়ভাবে সম্মিলিত নিরাপত্তায় জোর দিচ্ছে। সদস্য দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দীর্ঘদিন নিরপেক্ষ থাকা ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দেওয়ায় বাল্টিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বদলে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ইউরোপের নেতারা এখন আর পুরোপুরি মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করতে চাইছেন না। ফলে জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে বড় আকারের বিনিয়োগ শুরু করেছে।
রাজনীতিতে পূর্ব ইউরোপের প্রভাব বেড়েছে। পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার হুমকির বিষয়ে সতর্ক করে আসছিল। এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নে তাদের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। ইউক্রেন ও মলদোভাকে সদস্যপদের পথে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
এই যুদ্ধ আধুনিক যুদ্ধকৌশলের নতুন চিত্রও সামনে এনেছে। বড় অস্ত্রের পাশাপাশি সস্তা ড্রোন ও প্রযুক্তিনির্ভর আক্রমণ কৌশল যুদ্ধের ধরণ বদলে দিয়েছে। ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্প দ্রুত উৎপাদন বাড়াচ্ছে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ফলে ইউরোপ চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে। কারণ চীন রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়নি।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে গভীরভাবে নাড়া দিলেও সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় তাদের ভূমিকা সীমিত। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র যখন আলোচনায় সক্রিয়, তখন ইউরোপ অনেকটাই প্রান্তিক অবস্থানে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই যুদ্ধ ইউরোপকে নতুন বাস্তবতায় দাঁড় করিয়েছে। জ্বালানি নীতি, প্রতিরক্ষা কৌশল ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সবক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন এসেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, গত তিন দশকে ইউরোপে যত পরিবর্তন হয়নি, তার চেয়েও বড় রূপান্তর ঘটেছে এই কয়েক বছরে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: