• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬, ২৫ বৈশাখ ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. অর্থনীতি

ফাঁপানো এডিপির ফাঁদে উন্নয়ন: বাস্তবায়নহীন ‘থোক বরাদ্দে’ রেকর্ড,বাড়ছে অপচয় ও দুর্নীতির শঙ্কা।।


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: শুক্রবার, ০৮ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৭:০৬ পিএম;
ফাঁপানো এডিপির ফাঁদে উন্নয়ন: বাস্তবায়নহীন ‘থোক বরাদ্দে’ রেকর্ড,বাড়ছে অপচয় ও দুর্নীতির শঙ্কা

নজরুল ইসলাম আলীম:

 

দেশের অর্থনীতি যখন রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণের চাপ, মূল্যস্ফীতি ও বাস্তবায়ন সংকটে টালমাটাল—ঠিক তখনই সরকার ইতিহাসের সর্বোচ্চ আকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ঘোষণা করতে যাচ্ছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি কাগজে-কলমে বড় উন্নয়ন স্বপ্নের বার্তা দিলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কারণ, এডিপির প্রায় ৩৯ শতাংশই রাখা হয়েছে প্রকল্পবিহীন ‘থোক বরাদ্দ’ হিসেবে, যা দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা না বাড়িয়ে বরাদ্দের আকার বাড়ানো মূলত উন্নয়নের চেয়ে “সংখ্যার প্রদর্শনী”। বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ—চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। অর্থবছরের বাকি তিন মাসে অবশিষ্ট ৬৩ শতাংশ বাস্তবায়নের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে, তা কার্যত অবাস্তব ও প্রশাসনিক সক্ষমতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাস্তবায়নে ব্যর্থতা, তবু রেকর্ড বরাদ্দ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আসবে। অথচ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা, যার বড় অংশই এখনো অব্যবহৃত।গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হার নেমে এসেছিল ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশে—যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এমনকি করোনা মহামারির সময়ও বাস্তবায়ন হার এত নিচে নামেনি। সেই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে চলতি অর্থবছরেও। অথচ বাস্তবায়নের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার পরিবর্তে বরাদ্দের আকার আরও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বাড়ানো হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, “যেখানে মন্ত্রণালয়গুলো বরাদ্দকৃত অর্থই খরচ করতে পারছে না, সেখানে নতুন করে বিশাল বরাদ্দ উন্নয়ন নয়; বরং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও অপচয়ের ঝুঁকি বাড়াবে।”সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ‘থোক বরাদ্দ’ নিয়ে। প্রস্তাবিত এডিপির প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে থোক ও বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে। সাধারণত এই বরাদ্দ ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার তা কয়েক গুণ বেড়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থোক বরাদ্দের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর নির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক জবাবদিহি থাকে না। ফলে রাজনৈতিক বিবেচনা, অদক্ষতা, অস্বচ্ছতা এবং দুর্নীতির সুযোগ বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে এই বরাদ্দ পরবর্তীতে তড়িঘড়ি প্রকল্প অনুমোদনের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়, যেখানে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইও হয় না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য প্রস্তাবিত ২৬ হাজার ৮০৮ কোটি টাকার মধ্যে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকাই রাখা হয়েছে থোক বরাদ্দ হিসেবে। অর্থাৎ প্রায় ৭৮ শতাংশ বরাদ্দই প্রকল্পের বাইরে।একইভাবে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের ৮ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকার মধ্যে ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ। অথচ চলতি অর্থবছরে এই দুই বিভাগ নিজেদের বরাদ্দের পাঁচ ভাগের এক ভাগও বাস্তবায়ন করতে পারেনি।শিক্ষা খাতেও একই প্রবণতা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকার মধ্যে ১৬ হাজার ২৯৯ কোটি টাকাই থোক বরাদ্দ। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার মধ্যে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থোক হিসেবে রাখা হয়েছে।এতে স্পষ্ট হচ্ছে, যেসব খাত বাস্তবায়নে সবচেয়ে দুর্বল, সেখানেই সবচেয়ে বেশি অনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। ফলে উন্নয়নের নামে বিপুল অর্থ বছরের পর বছর অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

উন্নয়ন নাকি কাগুজে প্রবৃদ্ধি?বিশ্লেষকদের মতে, এডিপির আকার বড় দেখানো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে “উন্নয়নের বার্তা” দিলেও বাস্তব অর্থনীতিতে এর কার্যকারিতা সীমিত। কারণ, প্রকল্পের গুণগত মান, সময়মতো বাস্তবায়ন, ব্যয়ের দক্ষতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বড় বরাদ্দ কোনো অর্থবহ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না।বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, “শুধু এডিপির আকার বাড়ানো যথেষ্ট নয়; বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা, অপচয় নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি ব্যয়ের গুণগতমান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”তিনি আরও বলেন, “বিপুল থোক বরাদ্দ রেখে কাগুজে আকার বড় করা হলেও অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।”

সামনে বড় প্রশ্ন আগামী ৯ মে পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় নতুন এডিপি উপস্থাপন করা হবে। পরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—বাস্তবায়নের সক্ষমতা ছাড়া কেবল বরাদ্দের অঙ্ক বাড়িয়ে কি সত্যিই উন্নয়ন সম্ভব?বর্তমান বাস্তবতায় দেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল দক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, অপচয় রোধ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক বিনিয়োগ। কিন্তু সরকার সেই পথ এড়িয়ে আবারও “ফাঁপানো এডিপি”র পথে হাঁটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বাস্তবায়ন সক্ষমতা না বাড়িয়ে এভাবে থোক বরাদ্দের পাহাড় গড়ে তুললে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আরও ধীর হবে, বাড়বে অপচয় ও দুর্নীতির ঝুঁকি, আর শেষ পর্যন্ত জনগণের করের অর্থই পরিণত হবে কাগুজে উন্নয়নের অলংকারে।

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন