• ঢাকা
  • রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২২ চৈত্র ১৪৩২

Advertise your products here

  1. অর্থনীতি

জ্বালানি সংকটের ছায়ায় অর্থনীতি: মূল্যস্ফীতি, ভর্তুকির চাপ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার কঠিন সমী


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: রবিবার, ০৫ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৫:৫৫ পিএম;
জ্বালানি সংকটের ছায়ায় অর্থনীতি: মূল্যস্ফীতি, ভর্তুকির চাপ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার কঠিন সমী

নজরুল ইসলাম আলীম:

 

জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এই সংকট কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।রোববার শেরে বাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক বহুপক্ষীয় পরামর্শ সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এই উদ্বেগের কথা জানান। দেশের উত্তরণ প্রস্তুতি পর্যালোচনায় জাতিসংঘের সংস্থা UN-OHRLLS-এর একটি স্বতন্ত্র মূল্যায়ন সভায় উপস্থাপিত হয়, যেখানে অর্থনীতির বর্তমান দুর্বলতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো উঠে আসে।বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সংকটের প্রভাব একটি “চেইন রিঅ্যাকশন” তৈরি করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ার ফলে শিল্পখাতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিফলিত হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।মন্ত্রীও একই সুরে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ভর্তুকির মাধ্যমে চাপ সামাল দিচ্ছে। তবে এই ভর্তুকি দীর্ঘদিন ধরে বহন করা সরকারের পক্ষে টেকসই নয়। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।বর্তমানে সরকার একদিকে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়াতে চাচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় তহবিলের ওপর বাড়তে থাকা চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এই দ্বৈত সংকটকে অর্থনীতিবিদরা “ফিসক্যাল ট্র্যাপ” হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দেন, যদি সরকারি ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে এর বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই বর্তাবে। তাই এখনই সুষম ও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ জরুরি।মন্ত্রী স্বীকার করেছেন, দেশের অর্থনীতির প্রায় সব প্রধান সূচক বর্তমানে নিম্নমুখী। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি সক্ষমতা, শিল্প উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই চাপ স্পষ্ট। এর পেছনে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি, বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি নির্ভরতা বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কাজ করছে বলে জানালেও, তা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।সংকট উত্তরণে সক্ষমতা বৃদ্ধিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, কাঠামোগত সংস্কার ও দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট নীতিমালার সঙ্গে সমন্বয় করে অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।তিনি আরও জানান, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণ প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে উত্তরণ একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হয়ে উঠবে।সার্বিকভাবে বলা যায়, জ্বালানি সংকট এখন কেবল একটি খাতভিত্তিক সমস্যা নয়; এটি পুরো অর্থনীতির জন্য একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। স্বল্পমেয়াদে ভর্তুকি ও নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন গভীর সংস্কার, জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোর কৌশল।অন্যথায়, বর্তমান সংকট ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন