‘আপনি এক কলমের খোঁচায় আমার রিজিক কেড়ে নিয়েছেন’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সচিব পদবির একজন সরকারি কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন- ‘আমাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে দেশ ও জাতির কী অর্জন হলো?’ সরকারের সচিব হিসেবে পদোন্নতি প্রাপ্তির মাত্র ৮ মাসের মাথায় তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই তিনি বেকার এবং আর্থিক কষ্টের মধ্যে এক অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন।
প্রায় আঠার মাস সময়ের ‘প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সরকারে’র বিদায়ের পর বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) নিজের ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সরকারের মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স বিভাগ থেকে সমুদ্র বিজ্ঞানে মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করা মেধাবী ছাত্র ১৩তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ১৯৯৪ সালে ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দেন। রাজশাহীতে কর্মজীবন শুরু করে পরে কুমিল্লায় প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট, কক্সবাজার সদর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), চকরিয়া ও টেকনাফে সহকারী কমিশনার (ভূমি)সহ মাঠ প্রশাসনে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পদোন্নতি পেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব হন। এরপর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটে। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনে।
সর্বশেষ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে উন্নীত হন। কিন্তু দায়িত্ব পালনের মাত্র ৮ মাসের মাথায় তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি বুধবার নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দিয়েছেন—
স্যার,
আপনি নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে আমার মতো একজন নিরীহ কর্মচারীর ওপর জুলুম করেছেন। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে আপনি এক কলমের খোঁচায় আমার রিজিক কেড়ে নিয়েছেন।
সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক মান-সম্মান এবং আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। চাকরির যে সময়টাতে আমার জীবনে অর্জিত সব অভিজ্ঞতাকে উজাড় করে দিয়ে দেশের জন্য কাজ করার কথা ছিল, সে সময়টাতে জীবনে নেমে এসেছে সম্পূর্ণ অন্ধকার, হতাশা, যন্ত্রণা, অসহায়ত্ব আর বেকারত্বের দম বন্ধ করা এক অস্থির অনিশ্চিত সময়— এর দায় আপনার।
আপনি আজ চলে যাচ্ছেন উন্নত আলোকিত ব্যস্ত জীবনে। আপনার কাছে জানতে ইচ্ছা করে আমাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে কারো প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা ছাড়া দেশ ও জাতির কী অর্জিত হলো।
স্যার, অতৃপ্ত আত্মার দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আপনাকে অভিশাপ দিলাম আর বিচারের ভার ছেড়ে দিলাম প্রকৃতির ওপর।
প্রকৃতি একদিন তার আপন নিয়মেই এসবের বিচার করবে।’
পোস্টটিতে তিনি শেয়ার করেছেন বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার একটি ফটোকার্ডও। নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের ছবিসহ ফটোকার্ডে লেখা রয়েছে-‘দরিদ্র বাড়িয়ে বিদায় দারিদ্র্যের জাদুকরের।’ পোস্টটিতে অনেকেই মন্তব্য করেছেন প্রফেসর ইউনূসের তীব্র সমালোচনামূলক। জুয়েল মাহমুদ নামের একজন লিখেছেন- ‘আপনার মতো এমন হাজারো মেধাবীর কর্মসংস্থান কেড়ে নিয়েছে, এই সুদি ইউনূস। এই বিচার বাংলার মাটিতে হবে, ইনশাআল্লাহ।’ জামিল জাহাঙ্গীর নামের একজন মত্মব্যে লিখেছেন-‘ জালিমের নতুন সংস্করণ ইউনূসের বিচার চাই।’
এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত সচিব সাঈদ মাহমুদ বেলালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন-‘ আমি কেবল প্রশাসক নই— একজন স্বীকৃত সমুদ্রবিজ্ঞানীও। আন্তর্জাতিক জার্নালে আমার ২০টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সামুদ্রিক সম্পদ, উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা ও নীল অর্থনীতি নিয়ে আমার গবেষণা নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও গুরুত্ব পেয়েছে।’ তিনি বলেন, মাঠ প্রশাসনে থেকে দেশের জন্য কিছু করার সুযোগ তেমন থাকে না। সচিব পর্যায়ে গিয়ে নীতিনির্ধারণী ফোরামে অনেক কিছুই করার সুযোগ থাকে। কিন্তু মাত্র ৮ মাসের মধ্যে আমাকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হলো।
তিনি জানান, চাকরি হারিয়ে স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সন্তানদের লেখাপড়ার খরচসহ ঢাকায় বাড়ি ভাড়া যোগাড় করা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর চাকরিকালীন সময়ে কোনো বিভাগীয় অভিযোগের শোকজ নোটিশ পর্যন্ত তিনি পাননি। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতিরও অভিযোগ নেই বলে দাবি করেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার এই চাকরিহারা সন্তান।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
- বিষয়:
- ‘আপনি* এক,কলমের’
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: