নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন ও ছাত্রদলের আগামী নেতৃত্ব
মিডিয়া হাইপ নয়, চাই মেধা ও ত্যাগের সমন্বয়ে গড়া সাংগঠনিক নেতৃত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে নেতৃত্বের নীতিনির্ধারকদের প্রতি খোলা চিঠি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এটি শুধুমাত্র একটি সাংগঠনিক নির্বাচন নয়; বরং আগামী দিনের ছাত্ররাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতির দিকনির্দেশনার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ছাত্রসমাজের আশা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং পরিবর্তিত প্রজন্মের মানসিকতা সবকিছু মিলিয়ে ছাত্রদলের নেতৃত্বে চাই এমন সব তারুণ্যদীপ্ত নক্ষত্র যারা সাহসী, দক্ষ, আদর্শিক এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম।
বিদ্যমান বাস্তবতায় একজন সাধারণ নাগরিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে কিছু ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে চাই-
আমি মমিনুল ইসলাম জিসান ভাইকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই হলে বেশ কিছুদিন একই রুমে থাকার সুবাদে। তার ব্যক্তিত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনৈতিক ধৈর্য আমাকে বহুবার অনুপ্রাণিত করেছে। পরবর্তীতে ভাইকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতি করার কারণে। সেই ২০১৩ সালের শেষ দিক থেকে গণতন্ত্র হরণের বিরুদ্ধে দৃপ্ত পথচলা আর সেই পথচলায় তাঁর নিত্যসঙ্গী হল হামলা-মামলা আর কারাবাস।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে ক্যাম্পাসে বারবার সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগ কর্তৃক রক্তাক্ত হামলার শিকার হয়েও ক্যাম্পাস আঁকড়ে পড়ে থাকার নজির - জিসানের মতো - খুব সম্ভবত আর কারও নেই। সেই দুঃসময়ে যখন ক্যাম্পাসে তাঁর সাথে আড্ডা দেওয়াটাও ছিল এক বড় অপরাধ, তখনও তাঁকে দেখেছি সেই অমলিন হাসিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ ধরে রাখতে। আর আজ দেখি সারা বাংলায় হাজারো ছাত্র-জনতার এক আশার প্রতীক হয়ে আলো ছড়াচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
২০২৩ সালের সেই অন্ধকার অধ্যায়টি মনে করুন যখন সাদা পোশাকে পুলিশের পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়া হল, কয়েক দিন কী উৎকণ্ঠা "ভাই কোথায়"। পরে জানা গেল তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে ডিবি কার্যালয়ে (সাথে ছিলেন আরও বেশ কয়েকজন ছাত্রদল নেতা) যা দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তাঁকে নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল তখন। বিভিন্ন মামলার কারণে তিনি তখন প্রায় সাত মাস কারাবন্দি ছিলেন (এছাড়াও বিভিন্ন সময় মিলিয়ে ২ বছরের কিছু বেশি সময়)। তাঁর প্রতি সারাদেশে তাঁর অসংখ্য গুণগ্রাহী আর অনুসারীর যে কত দুয়া আর আবেগ তাও ছিল এক অভাবনীয় বিষয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সেই প্রতিকূল পরিবেশে যে বিরোধী কারও প্রতি ভালোবাসার প্রকাশও ছিল ভীতিকর। ভালোবাসায় মুড়ানো জিসান ভাই সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আদর্শিক দৃঢ়তা থেকে একটুও নড়েননি। কারামুক্তির পরেও তাঁকে আবার রাজপথে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিতে দেখি একই সাহস, একই নিষ্ঠা, একই কর্মস্পৃহা নিয়ে।
২৪-এর সেই ভয়াল দিনগুলোতে জিসানের নেতৃত্বের যে রূপ দেখেছি, তা যেন আজ ইতিহাস। মনে পড়ে ১৭ জুলাই, ২০২৪ এ যেদিন ক্যাম্পাসে গায়েবানা জানাজায় অংশ নেওয়াটাই ছিল চরম সাহসিকতার পরিচয়, আমরা অংশ নিলাম কত ভয় আর উৎকণ্ঠা নিয়ে, সেদিনও তিনি ছিলেন অবিচল। সেদিন ফুলার রোড দিয়ে যখন হাসিনা পতনের স্লোগান দিতে দিতে বিশাল এক মিছিল আসছিল, তখন লক্ষ্য করে দেখেছিলাম সেই মিছিলের নেতৃত্বে থাকা প্রতিটি মুখই জিসানের সাহচর্যে রাজনীতি করা সেই লড়াকু তরুণরা। জিসান ভাই কেবল নিজেই নেতৃত্বের গুণাবলিতে বলীয়ান নন, তিনি গড়ে তুলেছেন যোগ্য উত্তরসূরি যারা জাতীয়তাবাদী আদর্শকে বুকে ধারণ করে চরম দুর্দিনেও পিছপা হয় নি।
বর্তমানে রাজনীতিতে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় মিডিয়া হাইপ, সেলফিবাজি কিংবা টিভি টকশো করে আলোচনায় থাকাই যেন অনেকের কাছে রাজনীতির শেষ কথা। আজ অনেকেই কৃত্রিম জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকলেও অনেকেরই সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল। কিন্তু জিসান ভাই সেই ঘরানার বাহিরের মানুষ। তিনি শুধুই সাংগঠনিক ভিত্তি আঁকড়ে থাকা এক 'দল পাগল' নেতা, মাঠের কর্মীরা যাকে কেবল 'জিসান' নামেই এক নামে চেনে। প্রচারের আলো নয়, বরং সংগঠনের শিকড় মজবুত করতেই তার সমস্ত ব্যস্ততা।
আরও উল্লেখ্য যে, আজকের দিনে রাজনীতিতে নোংরামি যেন এক শিল্পে পরিণত হয়েছে, আর 'মববাজি' হয়ে উঠেছে ছাত্রত্বের এক বিকৃত রূপ। এই নোংরামির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এক নতুন শৃঙ্খল ও আধুনিক মননের ছাত্রসমাজের ডাক সবাই দিতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন নৈতিক দৃঢ়তা আর দৃপ্ত আহ্বান জানানোর সাহস। জিসান ভাই এই ক্ষেত্রে অনন্য। তিনি ছাত্ররাজনীতিতে নোংরামি আর মব কালচার নয়, বরং মেধা ও শৃঙ্খলার চর্চায় বিশ্বাসী বলেই জানি।
বহুল চর্চিত আরও একটি বিষয় আলোচনার দাবিদার। অনেকেই ত্যাগের ফিরিস্তি দিয়ে নিজেকে নেতৃত্বের দাবিদার হিসেবে জাহির করছে। এই ত্যাগের বিষয়টি প্রশ্নাতীত হতে পারে না। নেতৃত্ব নির্বাচনের মাপকাঠি কি শুধুই রাজপথের 'ত্যাগ' আর 'সাহসিকতা'? আমি মনে করি, ত্যাগ অপরিহার্য কিন্তু একমাত্র মাপকাঠি নয়। দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের বিকাশে সংগ্রামের ইতিহাসে অনেকের ত্যাগ আছে, এগুলো মূল্যায়িত হবে ইতিহাসের মানদণ্ডে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্বে অবশ্যই ত্যাগ আর সাহসের সাথে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ ঘিরে সুন্দর এক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারে যারা, তাদেরই আসা উচিত আগামীর কর্ণধার হিসেবে। স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার যে জাতীয়তাবাদী দর্শন, তার প্রতিফলন আজ খুব প্রয়োজন। জিসান ভাই হতে পারেন সেই অনন্য দর্শনের এক প্রায়োগিক রূপ। জনতার সাথে একাত্মতা আর দূরদর্শিতা সব মিলিয়ে তাঁকে শীর্ষ নেতৃত্বের আসনে বসানো আজ যেন সময়ের দাবি।
২৪ পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা কত ভিন্ন, তা শুধু ছাত্র-জনতার সাথে মিশে থাকা নেতারাই ভালো জানেন। আজ কেবল স্লোগান নির্মাণ আর জোর গলায় রাজপথ কাঁপানোই রাজনীতির শেষ কথা নয়। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদা ও মানদণ্ড বুঝে তা প্রয়োগ করে দেশের ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব। এক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্ব যেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এর ভিশনারি চিন্তাভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তিনি ‘৩১ দফা’র মাধ্যমে আগামীর বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরিতে কাজ করছেন। এই ভিশনকে সফল করতে ছাত্রদলে প্রয়োজন জিসানের মতো দূরদর্শী, কর্মনিষ্ঠ এবং আধুনিক মননসম্পন্ন সহযোদ্ধা।
নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা দিক আলোচনায় টানা বোধ করি বাংলাদেশের বাস্তবতায় খুব প্রয়োজন। তা হল স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিক পক্ষপাত কিংবা কোনো ক্ষুদ্র স্বার্থের প্রভাব যেন কোনোভাবেই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রাধান্য না পায়। ছাত্রদলের নেতৃত্ব হতে হবে যোগ্য, পরীক্ষিত এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আস্থা অর্জনকারী। আর তাই আমার বিশ্বাস সবকিছুর মানদণ্ডে ও সব ছাপিয়ে মমিনুল ইসলাম জিসান ভাই হবেন সারা বাংলার ছাত্রসমাজের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি।
সবশেষে, প্রিয় জিসানের জন্য শুভাশিষ অনিঃশেষ । সংগ্রামের পথ ধরে এগিয়ে যাক আপনার নেতৃত্ব, এবং আপনার হাত ধরেই রচিত হোক ছাত্রদলের নতুন গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। হয়ে উঠুন একজন মাহবুবুল হক বাবলু কিংবা তাঁকে ছাপিয়ে আরও ঊর্ধ্বে।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: