হলি আর্টিজানের ১০ বছর: বিশেষায়িত ইউনিটের স্থবিরতায় ফিরছে কি জঙ্গি শঙ্কা?
২০১৬ সালের ১ জুলাই; দিনটি ছিল শুক্রবার। দিনের আলো নিভতেই গুলশানের কূটনৈতিক এলাকার ৭৯ নম্বর রোডের রেস্তোরাঁ ‘হলি আর্টিজান বেকারি’ রূপ নিয়েছিল এক বিভীষিকাময় রক্তাক্ত উপাখ্যানে। রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে রেস্তোরাঁটিতে সশস্ত্র হামলা চালায় জঙ্গিরা, যা স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো বাংলাদেশকে। সেই রাতে ১৭ জন বিদেশিসহ মোট ২২ জন নিরীহ মানুষের নির্মম মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার ঘটনাটি ঘটে।
আজ প্রায় এক দশক পর, সেই ভয়াবহ স্মৃতি যখন মানুষের মনে এখনও দগদগে, ঠিক তখনই জনমনে নতুন প্রশ্ন— দেশে আবারও জঙ্গি তৎপরতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কি না?
গত কয়েক মাস আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় ‘সম্ভাব্য জঙ্গি হামলা’র আশঙ্কা জানিয়ে সতর্কতামূলক চিঠি পাঠানোর পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও দীর্ঘদিন বড় ধরনের কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি, তবুও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, দেশে জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। উগ্রবাদী কিছু সংগঠন নীরবে পুনর্গঠিত হয়ে অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারা ছোট ছোট সেল গঠন এবং লো-প্রোফাইল কার্যক্রমের মাধ্যমে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিশেষ করে কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে একাধিক বিস্ফোরণ এবং পরবর্তীতে জঙ্গি সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ১৭ জনের গ্রেপ্তারের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আবারও সতর্ক অবস্থানে নিয়ে আসে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক একটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে দেশীয় কয়েকজনের সম্পৃক্ততার লিংক এবং দেশীয় জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’র তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তদন্তে শুধু স্থানীয় নেটওয়ার্ক নয়, বরং পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’-এর (টিটিপি) সঙ্গে কিছু ব্যক্তির পরোক্ষ যোগাযোগ বা অনলাইন লিংকের তথ্যও উঠে এসেছে।
জঙ্গি দমনে গঠিত পুলিশের দুই বিশেষায়িত ইউনিট— সিটিটিসি ও এটিইউ’র কার্যকারিতা এখন প্রশ্নের মুখে। গুরুত্বপূর্ণ কেপিআই বা স্থাপনায় জঙ্গি হামলার সতর্কবার্তার মধ্যেই তারা মাদক, ছিনতাই ও রাজনৈতিক মামলার মতো প্রচলিত অপরাধ দমনে ব্যস্ত সময় পার করছে। ডিএমপির তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে সিটিটিসি কর্তৃক গ্রেপ্তারকৃত ১৫২ জনের মধ্যে মাত্র ১১ জনের বিরুদ্ধে উগ্রবাদের অভিযোগ রয়েছে, বাকিরা সাধারণ অপরাধী
জঙ্গি দমনে বিশেষায়িত ইউনিটের বর্তমান সক্ষমতা ও চ্যালেঞ্জ
বর্তমান নিরাপত্তা সতর্কতার মুখে উগ্রবাদ দমনে গড়ে ওঠা বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। পুলিশের জঙ্গিবিরোধী দুই বিশেষায়িত ইউনিট— কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) ভূমিকা এখন বিভিন্ন মহলে সমালোচিত। অভিযোগ রয়েছে, উগ্রবাদ মোকাবিলার জন্য তৈরি এই দুই ইউনিট বর্তমানে মাদক-কারবারি, ছিনতাইকারী, রাজনৈতিক মামলার আসামি এবং প্রচলিত অপরাধ দমনের কাজেই বেশি ব্যস্ত সময় পার করছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত সিটিটিসি মোট ১৫২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে মাত্র ১১ জনের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বাকি ১৪১ জনই মাদক-কারবারি, ছিনতাইকারী, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিসহ বিভিন্ন প্রচলিত অপরাধে অভিযুক্ত। একইভাবে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) ৫০ থেকে ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করলেও তাদের অধিকাংশই প্রচলিত অপরাধী। জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বড় অভিযান বা তৎপরতা এই ইউনিটের পক্ষ থেকে চোখে পড়ছে না।
‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মধ্য দিয়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রায় ১২ ঘণ্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের অবসান হয় / ছবি- সংগৃহীত
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় যখন জঙ্গি হামলার সতর্কতা জারি করা হয়েছে, তখন এই বিশেষায়িত ইউনিটগুলো কেন প্রচলিত অপরাধ দমনে ব্যস্ত?
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়, দেশে জঙ্গিবাদ পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভিন্ন এবং অনেক ঘটনায় অতীতের তুলনায় ভিন্ন ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। এরপর থেকেই সিটিটিসি ও এটিইউ’র জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে কিছুটা শিথিলতা দেখা যায়। পরবর্তীতে ইউনিট দুটি মূলত প্রচলিত অপরাধ দমনের দিকেই বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে, যার মধ্যে মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট অভিযান বেশি দেখা যায়।
উগ্রবাদ আছে, ‘জঙ্গি নেই’: আত্মতুষ্টির আড়ালে বাড়ছে কি ঝুঁকি?
হলি আর্টিজান হামলার ৯ বছর, ভয়-ঝুঁকি কতটা কমলো?
তবে, সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, আগে সিটিটিসিতে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ বিষয়ে দক্ষ এবং দীর্ঘদিন কাজ করা বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হতো। তবে, ৫ আগস্টের পর থেকে ইউনিটটিকে অনেকটাই ‘ডাম্পিং পোস্টিং’-এ পরিণত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করা অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অনেককে বিভিন্ন ইউনিটে বদলি করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ জুলাই-আগস্টের হত্যা মামলার আসামি হওয়ায় আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে বর্তমানে সিটিটিসিতে জঙ্গিবাদ নিয়ে গভীরভাবে কাজ করার মতো অভিজ্ঞ কর্মকর্তার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যারা বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন, তারা চেষ্টা করলেও জঙ্গিবাদসংক্রান্ত অপরাধের ধরন অন্য সব অপরাধের চেয়ে ভিন্ন হওয়ায় বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে সময় লাগছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে এক ধরনের শিথিলতা দেখা গেছে। অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বদলি এবং জুলাই-আগস্টের মামলার কারণে অনেকের আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় সিটিটিসিতে বড় ধরনের দক্ষ জনবল সংকট তৈরি হয়েছে। একে ‘ডাম্পিং পোস্টিং’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ফলে, নতুন কর্মকর্তাদের জটিল উগ্রবাদী অপরাধের ধরন ও কৌশল আয়ত্ত করতে বেগ পেতে হচ্ছে
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিটিটিসি’র এক কর্মকর্তা বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইউনিটটির জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছিল। আগের অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তার বদলি ও বিভিন্ন কারণে ইউনিটটিতে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এখন আবার নতুন করে টিম গঠন ও কার্যক্রমকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে। তবে, পুরো সক্ষমতা ফিরে পেতে কিছুটা সময় লাগবে।
একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে এটিইউতেও। ৫ আগস্টের পর কিছু কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে কাজ করার উদ্যোগ নিলেও বিভিন্ন ধরনের চাপ ও বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এটিইউর এক কর্মকর্তা বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ইউনিটটি জঙ্গিবিরোধী কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছিল। তবে, ওইসব অভিযানের পর বিভিন্ন ধরনের চাপ ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। একপর্যায়ে অনেক কর্মকর্তা নিজেদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযান পরিচালনায় অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেন। ফলে পরবর্তীতে ইউনিটটির তৎপরতা মূলত প্রচলিত অপরাধ দমন কার্যক্রমের দিকেই বেশি।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে এক ধরনের শিথিলতা দেখা গেছে / ছবি- সংগৃহীত
পূর্বে জঙ্গি দমনে কাজ করা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অতীতে দেশের জঙ্গিবিরোধী বিশেষায়িত ইউনিটগুলো সফলভাবেই একাধিক বড় অভিযান পরিচালনা করেছে এবং উগ্রবাদ দমনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। গোয়েন্দা নজরদারি, অনলাইন মনিটরিং, তথ্য বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ের অভিযান নিয়মিত ছিল। কিন্তু এখন সেই ধারাবাহিকতা অনেকটাই কমে যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশে যদি আবার উগ্রবাদী তৎপরতার শঙ্কা তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর মূল ফোকাসও সেদিকেই থাকা উচিত।’
এ বিষয়ে গত ২৫ এপ্রিল ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি ইউনিটের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই, আমরা কাজ করছি, ইনশাআল্লাহ আমরা এটা ফেস করতে পারব। দেশে জঙ্গি বা উগ্রবাদী আছে কি নেই— এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করার মতো অবস্থায় এখনই যাওয়া সম্ভব নয় এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও নজরদারি চলমান রয়েছে।’
তবে, এসব বিষয়ে সার্বিক তথ্য এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদের সার্বিক পরিস্থিতি কেমন— জানতে সিটিটিসি ও এটিইউ প্রধানকে ফোন করা হলেও তারা ফোন ধরেননি। যদিও সিটিটিসি প্রধান সরকারি যে নম্বরটি ব্যবহার করেন তা অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে। হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার এক দশক পূর্তি উপলক্ষ্যে সিটিটিসির একজন যুগ্ম কমিশনারকেও একাধিকবার ফোন করা হয়, কিন্তু তিনিও কল রিসিভ করেননি।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: