আইফোনের লোভে সন্তানকে বিক্রি: দেড় বছরের শিশু মুসার সুরক্ষায় পাশে দাঁড়ালেন ইউএনও
লিটু দেবনাথ, পটুয়াখালী:
আইফোনের শৌখিনতার কাছে হেরে গিয়েছিল পৈতৃক মায়া। টাকার লোভে নিজের দেড় বছরের শিশু সন্তান মুসাকে বিক্রি করে সেই টাকায় আইফোন কেনার মতো এক হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন কুলাঙ্গার বাবা। তবে সব শঙ্কা কাটিয়ে অবুঝ শিশু মুসার জীবনের সুরক্ষায় ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এসেছেন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান। শিশুটির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তার নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলাসহ যাবতীয় সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকালে নিজ কার্যালয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই মানবিক উদ্যোগের কথা জানান ইউএনও। এ সময় তিনি শিশু মুসার শোকার্ত দাদা মফিজ মুন্সী ও দাদি মাহফুজা বেগমের হাতে ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা তুলে দেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে মূলত পারিবারিক কলহকে কেন্দ্র করে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের বড় গোপালদী গ্রামের কাঠমিস্ত্রি মারুফ মুন্সির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক অশান্তি চলছিল। এর জেরে এক মাস আগে তার স্ত্রী শিশু মুসাকে রেখেই বাপের বাড়ি চলে যান।
গত শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে বাবা মারুফ তার মা মাহফুজা বেগমের কাছ থেকে দেড় বছরের শিশুপুত্র মুসাকে ‘ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার’ বাহানা করে বাড়ি থেকে বের হন। সারাদিন কেটে গেলেও তারা না ফেরায় পরিবারের সন্দেহ দানা বাঁধে। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে স্বজনরা জানতে পারেন, পাষণ্ড বাবা মারুফ আলীপুর ইউনিয়নের রামনাথসেন গ্রামের ইমরান হোসেনের কাছে মাত্র ১ লাখ টাকার বিনিময়ে তার বুকের ধন মুসাকে বিক্রি করে দিয়েছেন! আর সেই বিক্রির টাকায় নিজের শখ মেটাতে কিনে ফেলেছেন একটি আইফোন।
এই নৃশংস ঘটনা মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। টনক নড়ে প্রশাসনের। শিশুটিকে উদ্ধারে মাঠে নামে পুলিশ। গত রোববার সন্ধ্যায় অভিযুক্ত বাবা মারুফকে আটক করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই সন্তান বিক্রির লোমহর্ষক তথ্য স্বীকার করেন তিনি।
মারুফের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ক্রেতা ইমরান হোসেনকে থানায় তলব করা হয়। এরপর পুলিশের নির্দেশনায় ক্রেতার শ্বশুর মাহবুব গাজী গলাচিপা উপজেলার চর বিশ্বাস এলাকা থেকে শিশু মুসাকে উদ্ধার করে নিরাপদে দশমিনা থানায় নিয়ে আসেন। গত রোববার রাত ১০টার দিকে দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান ও দশমিনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতিকুল ইসলামের উপস্থিতিতে শিশুটিকে তার দাদা-দাদির জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়।
অবুঝ এই শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা কাটছে না সচেতন মহলের। এ বিষয়ে দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান বলেন, “শিশুটিকে উদ্ধার করে ইতোমধ্যে তার দাদা-দাদির জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। মুসার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সুধীজনদের নিয়ে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের কাজ চলছে। তার নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার সব ধরনের পদক্ষেপ নিশ্চিত করা হবে।”
পাষণ্ড বাবার লোভের শিকার হয়ে যে শিশুটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল, প্রশাসনের এই সময়োপযোগী ও মানবিক পদক্ষেপে এখন তার আগামীর দিনগুলোতে যুক্ত হলো এক নতুন আশার আলো।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: