• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

কী পেল মধ্যবিত্ত?


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০২:০৫ পিএম;
কী পেল মধ্যবিত্ত

সীমিত আয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যয়ের বোঝা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির আগুনে মধ্যবিত্তের সংসারে উত্তাপ।

নিম্ন আয়ের মানুষ সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে নানা ধরনের সহায়তা পেলেও মধ্যবিত্তের ভাগ্যে তা জোটে না। আবার লোকলজ্জার ভয়ে কোথাও গিয়ে হাত পাতাও তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে এই শ্রেণির মানুষের জীবনে ভোগান্তি বাড়িয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট পেশ করেছেন।

নতুন সরকারের প্রথম এই বাজেট ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় করদাতা ও নীরব গোষ্ঠী ‘মধ্যবিত্ত’ এই বাজেটে কতটা গুরুত্ব পেল? ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে তারা আসলে কী পেল? বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার মধ্যবিত্তের জন্য কিছু স্বস্তির ব্যবস্থা রেখেছে। তবে একই সঙ্গে এমন কিছু সিদ্ধান্তও আছে, যা তাদের ব্যয় আরো বাড়াতে পারে। ফলে বাজেটকে মধ্যবিত্তের জন্য পুরোপুরি স্বস্তির বলা যাচ্ছে না।
 

মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে মধ্যবিত্ত

মধ্যবিত্তের এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা মূল্যস্ফীতি। বাজারে সব পণ্যের দামে আগুন। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে সবজি—সবকিছুর দাম আকাশচুম্বী। গত মে মাসের হিসাবে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকার জিনিস কিনতে এখন প্রায় ১১০ টাকা লাগছে।

সরকার বাজেটে এই মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছে। এটি যদি সত্যি সফল হয়, তবে মধ্যবিত্ত সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। কিন্তু বাজেট বড় হওয়ার কারণে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে। ফলে দাম কতটা কমবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মনে সংশয় আছে।
অর্থমন্ত্রী মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রথমত, করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে। আগে সাড়ে তিন লাখ টাকা ছিল। এখন পৌনে চার লাখ টাকা করা হয়েছে। নারী ও প্রবীণদের জন্য সাড়ে চার লাখ টাকা।

দ্বিতীয়ত, নিত্যপণ্যে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, গুঁড়া দুধসহ ১২টি জরুরি পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে বাজারে দাম কিছুটা কমতে পারে।

তৃতীয়ত, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ৫০টি ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট ও ট্যাক্স মওকুফ করা হয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের ওষুধের খরচ কমবে।

চতুর্থত, শিক্ষা উপকরণের দাম কমানো হয়েছে। খাতা, কলম, পেনসিল, জ্যামিতি বক্সের স্থানীয় উৎপাদন কর কমানো হয়েছে। অভিভাবকদের জন্য এটি স্বস্তির খবর।

পঞ্চমত, ডিজিটাল ওএমএস কার্ড চালু করা হচ্ছে। বড় শহরে সীমিত আয়ের চাকরিজীবীরা লাইনে না দাঁড়িয়ে সুলভ মূল্যে পণ্য কিনতে পারবেন।

মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে ৬০ নিত্যপণ্যে কর ছাড়

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাপক কর ছাড়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে চায়।

প্রস্তাবে ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি, ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের উৎস কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে বাজারে সরবরাহ ব্যয় কমে উপকৃত হবে ভোক্তারা।

এ ছাড়া কিডনি ডায়ালিসিস ফিল্টারে অগ্রিম কর প্রত্যাহার, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পণ্যে কর কমানো, ইলেকট্রিক বাস-ট্রাক ও চার্জিং স্টেশনে উৎস কর মওকুফের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল ও প্রযুক্তিপণ্য আমদানিতে কর কমছে। ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের আশা, এসব পদক্ষেপ উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়াবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ লাঘব করবে। মেট্রোরেলে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে গণপরিবহন অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর ফলে বাস ভাড়া বাড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, মধ্যবিত্ত ভোগব্যয় করে অর্থনীতি চালায়। তাদের সঞ্চয় কমলে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই বাজেট তাদের জন্য আংশিক স্বস্তি এনেছে। পুরো স্বস্তির জন্য আরো পদক্ষেপ দরকার। সাধারণ মধ্যবিত্তের আসল স্বস্তি বাজারের ওপর নির্ভর করে। পকেটের টাকা বাঁচিয়ে মাস চালানো কঠিন হলে অন্য সুবিধা কাজে আসবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না করলে এগুলো কাগজি স্বস্তি হয়ে থাকবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা-সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাধারণত, বাজেটে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য কিছু উদ্যোগ থাকলেও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য সুনির্দিষ্ট সহায়তার পরিধি তুলনামূলকভাবে সীমিত। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছে এই শ্রেণিটি। নিম্ন আয়ের মানুষ কিছু সরকারি সহায়তা পায়, উচ্চ আয়ের মানুষ মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা তুলনামূলকভাবে সামাল দিতে পারে, কিন্তু মধ্যবিত্তের প্রকৃত আয় ও সঞ্চয় দুটোই ক্ষয় হচ্ছে।’

ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘মধ্যবিত্তের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তাদের জন্য নতুন কোনো ভর্তুকি বা নগদ সহায়তার চেয়ে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ বেশি প্রয়োজন। বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা ও কারসাজি কমানো, কৃষি উৎপাদন ও আমদানি ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অনুসরণ করা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘এ ছাড়া কর ব্যবস্থায় মধ্যবিত্তবান্ধব সংস্কার প্রয়োজন। করমুক্ত আয়সীমা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সমন্বয়, তাদের ওপর থেকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যয়ের চাপ কমানো এবং একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবার মান উন্নত করা গেলে মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমবে।’

পলিসি এক্সচেঞ্জেরে চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে মধ্যবিত্তের উপস্থিতি অস্বীকার করার উপায় নেই। করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যে কর কমানো এবং স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিপণ্যে কিছু ছাড় এসব ইতিবাচক উদ্যোগ। সরকার মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করলেও এটি পরোক্ষেই স্বীকার করে নিচ্ছে যে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট এখনো তীব্র। ফ্যামিলি কার্ড, ভাতা ও খাদ্য সহায়তা যেমন দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক, তেমনি মধ্যবিত্ত এই সুরক্ষা কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে। সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামো পেলেও বেসরকারি চাকরিজীবী ও শহুরে মধ্যবিত্তের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কমই।’

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘করমুক্ত আয়সীমা ৩.৫০ লাখ থেকে ৩.৭৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে স্বস্তি আংশিক, কারণ এই সীমা অতিক্রম করলেই করহার ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ থেকে শুরু হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর চাপ পুরোপুরি কমছে না। নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য সীমা আরো বাড়ানো হলেও মূল্যস্ফীতির তুলনায় এই স্বস্তি খুব বড় নয়। বর্তমান সংকট মোকাবেলায় মধ্যবিত্তের জন্য কর-স্বস্তি, নগর ব্যয় সহায়তা, স্বাস্থ্য-শিক্ষায় রেয়াত ও বাজারদর নিয়ন্ত্রণ জরুরি।’

তবে বাজেটে কিছু চাপও আছে। ১২০০-১৬০০ সিসি গাড়ির কর অনেক বেড়েছে। মধ্যবিত্তের গাড়ি কেনা আরো কঠিন হবে। বিদেশি কাজুবাদাম, মধু, খেলনা, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, টাইলসের দামও বাড়বে। রডের দাম বেড়ে বাড়ি নির্মাণের খরচ বাড়বে।

সঞ্চয়পত্রে কর দ্বিগুণ, কমছে রেয়াত সুবিধাও

প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগমাধ্যম সঞ্চয়পত্রে কর দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কমানো হচ্ছে বিনিয়োগসংক্রান্ত কর রেয়াতের সুবিধাও। অথচ সম্পদশালীদের সম্পদের ওপর করের হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের মালিককে সুদ আয়ের ওপর এখন থেকে ন্যূনতম ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে, যা আগে ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। বর্তমানে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে মুনাফার সময় ৫ শতাংশ উৎস কর কেটে রাখা হয়, আর এর বেশি অঙ্কের ক্ষেত্রে কাটা হয় ১০ শতাংশ।

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন