প্রতিদিন ১১০ মামলা চার মাসে দেশে ১১৪২ হত্যা, বাড়ছে অপরাধ
দেশজুড়ে খুন, অপহরণ, ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি এবং নারী-শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এসব অপরাধে সারা দেশে মোট ১৩ হাজার ২২১টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে খুন হয়েছেন এক হাজার ১৪২ জন। পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে তিন হাজার ৩০৫টি এবং প্রতিদিন প্রায় ১১০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায়। চার মাসে এ ধরনের মামলা হয়েছে পাঁচ হাজার ৯৯৮টি। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৫০টির বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে।
একই সময়ে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে চার হাজার ৯৯টি। প্রতিদিন গড়ে ৩৪টি করে মামলা হয়েছে এ খাতে। এছাড়া অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৪৭টি, ডাকাতির ঘটনায় ১৮৪টি এবং দস্যুতার ঘটনায় ৫৯১টি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে এক হাজার ১৪২টি। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৪৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, আর্থিক অস্থিরতা, ব্যক্তিগত বিরোধ, সামাজিক অবক্ষয় এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপের ঘাটতির কারণে অপরাধ বাড়ছে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে হত্যা করা হয়। ঘটনার দুই সপ্তাহ পার হলেও জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত এগিয়ে চলছে। তিনি বলেন, খুনিদের মোটরসাইকেলের গতিপথ রায়েরবাজার পর্যন্ত শনাক্ত করা হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বরিশালে মাছ ব্যবসায়ী বাবু শিকদারকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে মা-মেয়ের মরদেহ উদ্ধার এবং গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজনকে হত্যার মতো ঘটনাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনায় এসেছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, টহল বৃদ্ধি, সিসিটিভি নজরদারি এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। তবে সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় পুলিশ সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। তাই অপরাধ দমনে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন।
অপরাধ বিশ্লেষক এবং টাঙ্গাইলের মাওলানা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে অপরাধীরা সুযোগ পাচ্ছে এবং অপরাধের হার বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: