হামে ৩০ বছরের ছেলেকে হারিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন বৃদ্ধ বাবা
খবরের কাগজে চোখ রাখলেই সাম্প্রতিক সময়ে চোখ আটকে যায় হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর খবরে। কিন্তু এবারই প্রথম হামে আক্রান্ত হয়ে খবরে জায়গা হলো মাদারীপুরের ৩০ বছরের যুবক মিরাজ হোসেনের। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান মিরাজের দুই মেয়ে- মাহিরা ইসলাম ও তাহিরা ইসলাম। মাহিরার বয়স দেড় বছর, আর তাহিরার মাত্র ৪ মাস। গত ৩ মে রাজধানীর ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালে মারা যান মিরাজ।
মিরাজের স্ত্রী খাদিজা আক্তারের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, গত মাসের ২৪ তারিখ জ্বর আসে তার স্বামীর। ছেড়ে ছেড়ে জ্বর আসতে থাকে। কিছুই খেতে পারতেন না, এমনকি পানি খেতেও কষ্ট হতো। পরে ২৭ তারিখ মাদারীপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় মাদারীপুর নিরাময় হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে ভর্তির পরদিনই শরীরে র্যাশ ওঠে। চোখের ভেতরটাও লাল হয়ে যায় ভয়াবহভাবে। পরে চিকিৎসকরা অবস্থার অবনতি দেখে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। ২ মে ঢাকায় আনার পর প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়, সেখান থেকে পাঠানো হয় ডিএনসিসি হাসপাতালে।
ছোট্ট মাহিরা ও তাহিরার কথা উঠতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন খাদিজা। তিনি বলেন, বড় মেয়ে মাহিরার বয়স মাত্র দেড় বছর। ওরা এখনও বুঝতেই পারে না যে তাদের বাবা আর নেই। শুধু তাকিয়ে থাকে। মিরাজ সারাদিন রিকশা চালিয়ে বাড়ি ফিরে মেয়েদের নিয়েই থাকতো। মেয়েদের খুব ভালোবাসতো সে। মেয়েরা অসুস্থ হলে মিরাজ নিজেই সব সামলাতো।
সংসার কীভাবে চলবে- এমন প্রশ্নের জবাবে খাদিজা বলেন, আমার স্বামীর আয় দিয়েই আমাদের ছয়জনের সংসার চলতো। আমার শ্বশুর কথা বলতে পারেন না, চোখেও কম দেখেন। শাশুড়িও অসুস্থ। ছেলেকে হারিয়ে মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছেন তিনি। সংসার চালানোর মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। অসুস্থতার কারণে আমার বৃদ্ধ শ্বশুর এতদিন কোনো কাজ করতে পারতেন না। এখন বাধ্য হয়ে এই বয়সে রিকশা চালাতে যাচ্ছেন। আমাদের এমন কোনো আত্মীয়-স্বজনও নেই, যারা আমাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াবে।
মিরাজের চিকিৎসায় কত টাকা খরচ হয়েছে জানতে চাইলে খাদিজা বলেন, প্রায় ৪০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। আমরা দিন আনি দিন খাই। হাতে কোনো জমানো টাকা ছিল না। তাই নিজের কানের দুল বন্ধক রেখে মিরাজের চিকিৎসার খরচ চালিয়েছি। আমি নিজের চিন্তা করি না, মিরাজের রেখে যাওয়া দুই আদরের মেয়েকে কীভাবে মানুষ করবো, সেটাই ভেবে কূল পাই না।
সরকারের প্রতি সহায়তার আবেদন জানিয়ে খাদিজা বলেন, সরকার যেন আমার মেয়ে দুটোর দিকে তাকিয়ে তাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেয়। যাতে আমি সন্তান দুটোকে মানুষ করতে পারি। সরকারের পক্ষ থেকে যদি কোনো সহায়তা না পাই, তাহলে আমাদের পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
ডিএনসিসি হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ৪ হাজার ৬৭৯ জন। এদের মধ্যে ৯ মাসের কম বয়সী রোগীর সংখ্যা ৮০০ জন। যা মোট রোগীর ১৭ শতাংশ। এছাড়া ১০ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যে হাম ও হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৪৩ জন যা মোট রোগীর ২৬ শতাংশ। ২ থেকে ৫ বছর বয়সী ৯৫৩ জন, ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী ৬১৪ জন, ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৩২৩ জন, ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৪৮৮ জন এবং ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে হাম ও হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২৫৮ জন রোগী।
এদিকে গত দুই মাসে সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৩৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ৭০ জন ও হাম উপসর্গে মারা গেছে ৩৬৯ জন। একই সময়ে সারাদেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৭ হাজার ৩০৫ জন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৫৪ হাজার ৪১৯ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগে হাম উপসর্গে মারা গেছে ১৯২ জন ও আক্রান্ত হয়েছে ২৯ হাজার ৪৮১ জন।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: