তিন মাসে হাম বেড়েছে ৭৫ গুণ
তিন মাসের হিসাব
হাম বেড়েছে ৭৫ গুণ
- ২০২৫ : জানু-মার্চ রোগী ৯
- ২০২৬ : জানু-মার্চ ৬৭৬
- ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ এক বছর টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত
- অন্তর্বর্তী সরকার টিকা না দেওয়ায় হামের প্রাদুর্ভাব : ডা. রফিকুল ইসলাম
দেশে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হামের উদ্বেগজনক বিস্তার ঘটেছে। এই সময়ে ৬৭৬ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ গুণ বেশি। ২০২৫ সালের একই সময়ে আক্রান্ত ছিল মাত্র ৯ জন, ২০২৪ সালে ছিল ৬৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগেই হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত এই রোগে মৃত্যুর কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। যদিও বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে ৪১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ১৫ জন, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ছয়জন, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঁচজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে চারজন এবং রাজশাহী, পাবনা ও গোপালগঞ্জে একজন করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায় আরো আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি, মায়ের বুকের দুধ কম পান, কৃমিনাশক ওষুধ না খাওয়া এবং অপুষ্টির কারণে হামের সংক্রমণ বেড়েছে। পাশাপাশি ভাইরাসের ধরনে কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার কথা বলছেন তাঁরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বছর ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ২৪৫ জন (৩৬.২৪ শতাংশ) আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। এরপর রাজশাহীতে ১৩৭ জন (২০.২৬ শতাংশ), চট্টগ্রামে ৯৩ জন (১৩.৭৫ শতাংশ), ময়মনসিংহে ৮০ জন (১১.৮৩ শতাংশ), বরিশাল ও খুলনায় ৫১ জন করে (৭.৫৪ শতাংশ), সিলেটে ১৩ জন (১.৯২ শতাংশ) এবং রংপুরে ছয়জন (০.৮৮ শতাংশ) হাম আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে।
৯ মাসের বদলে ৬ মাস থেকে হামের টিকা : পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু করে মাসব্যাপী এই কর্মসূচিতে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা টিকা পাবে।
গতকাল সকালে ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশিদ।
তিনি বলেন, হামের নিয়মিত টিকাদান চলছে।
দেশে চলমান হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি মোকাবেলায় এই বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন হাতে নেওয়া হয়েছে। এটি অতিরিক্ত উদ্যোগ হিসেবে পরিচালিত হবে।
হালিমুর রশিদ বলেন, ক্যাম্পেইন শুরুর আগে নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অভিভাবকদের জানানো হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক জোট গ্যাভি থেকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, টিকা ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে টিকা সরবরাহ শুরু হয়েছে; পর্যায়ক্রমে সিরিঞ্জসহ অন্যান্য সরঞ্জামও পৌঁছাবে।
‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টিকা আনব’ : টিকার ঘাটতি দূর করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে টিকা আনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। কত দিনের মধ্যে টিকা আনা হবে—এমন প্রশ্নে সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ বলতে না পারলেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেনে, ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা আনব।’
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ তথ্য জানান।
দেশে এখন হামের কী অবস্থা—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘হাম হচ্ছে, আমরা মোকাবেলা করছি।’ সে জন্য আরো ২০টি ভেন্টিলেটর দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি আরো বেশি চিকিৎসক ও নার্সকে চিকিৎসায় যুক্ত করার কথাও বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
শিশুদের টিকা প্রদান নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘২০১৮ সালে একটা ক্যাম্পেইন হয়েছে, এরপর কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি। এখন যে মিজেলসগুলো (হাম) হচ্ছে, ওদের মধ্যে যে আউটব্রেক (প্রাদুর্ভাব) হয়েছে, যারা ভ্যাকসিনেটেড না তাদের মধ্যে বেশি করে, মারাত্মকভাবে মিজেলসটা দেখা দিয়েছে।’ এ ব্যাপারে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের জেনারেল ও পেডিয়াট্রিক সার্জারি এবং স্টেম সেল বিভাগের অধ্যাপক ডা. এস এম খালিদ মাহমুদ শাকিল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকার শিশুদের নিয়মিত এই টিকা প্রদান করে আসছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ এক বছরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। সে কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার টিকা না দেওয়ায় হামের প্রাদুর্ভাব : ডা. রফিকুল ইসলাম
অন্তর্বর্তী সরকার সময়মতো টিকা প্রদান না করায় দেশে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম।
গতকাল সোমবার সকালে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে তিনি এ মন্তব্য করেন। হামের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে শিশুদের টিকা দেওয়া হলেও চার মাস বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। কেন নির্ধারিত সময়ের আগেই সংক্রমণ ঘটছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তা হলে প্রাথমিক পর্যায়েই রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল করা সম্ভব হবে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
- বিষয়:
- তিনমাসে* হাম,বেড়েছে৭৫গুণ
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: