• ঢাকা
  • শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

৩০০ টাকা পিস কেনা চামড়া ১০০ টাকায় বিক্রি


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২:০২ এএম;
৩০০ টাকা পিস কেনা চামড়া ১০০ টাকায় বিক্রি

কোরবানির ঈদ এলেই একসময় জয়পুরহাটের হাটবাজারগুলো জমে উঠত পশুর চামড়ার কেনাবেচায়। ঈদের দিন দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গড়ে ওঠে জেলার বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী চামড়ার বাজার।

গ্রামগঞ্জ থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ভ্যান, নসিমন, করিমন ও পিকআপভর্তি চামড়া নিয়ে আসতেন আড়তে। কিন্তু এবার সেই চিত্র যেন পুরোপুরি উল্টো। বাজারজুড়ে ক্রেতা সংকট, আড়তদারদের সিন্ডিকেটের অভিযোগ, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া অর্থ এবং চামড়ার অস্বাভাবিক দাম পতনের কারণে জয়পুরহাটে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা, মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো।

জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, এ বছর অধিকাংশ গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ২০০ থেকে ৪০০ টাকায়। কোথাও কোথাও মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ১০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গ্রামের কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে ৩০০ থেকে ৮০০ টাকায় চামড়া কিনে আড়তে এনে বিক্রি করতে হয়েছে ১০০ থেকে ৩০০ টাকায়। এতে পরিবহন খরচ, শ্রমিক মজুরি তো উঠছেই না, উল্টো মূলধন হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে অনেকের।

জয়পুরহাট সদর উপজেলার উত্তর জয়পুর গ্রামের আতাউর রহমান বলেন, ‘আগে ঈদের সময় চামড়া বিক্রি করে বাড়তি কিছু আয় হতো। এখন দাম এত কমে গেছে যে মানুষ চামড়া বিক্রি না করে ফেলে রাখছে। আমি নিজেই ৩০০ টাকায় কেনা চামড়া ১০০ টাকায় বিক্রি করেছি।

কালাই উপজেলার জুম্মাপাড়া মহল্লার জাহিদুল ইসলাম বলেন, সরকার দাম ঠিক করে দিলেও বাস্তবে সেই দামে কেউ চামড়া কিনছে না। পুরো বাজার এখন আড়তদারদের নিয়ন্ত্রণে।

সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ক্ষেতলাল উপজেলার দাশড়া গ্রামের হানিফ হোসেন জানান, এক সময় ব্যবসায়ীরা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে চামড়া কিনে নিয়ে যেত। এখন উল্টো ব্যবসায়ীদের চামড়া নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে। দাম এত কম যে অনেক মানুষ চামড়া মাটিতে ফেলে রাখছে।

ঈদের দিন বিকেলে জয়পুরহাট শহরের বাসস্ট্যান্ড, নতুনহাট ও মহাসড়কসংলগ্ন অস্থায়ী চামড়ার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার পাশে ছোট ছোট স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়েছে গরু ও ছাগলের চামড়া। খাসির চামড়ার অবস্থা আরো ভয়াবহ। অনেক ব্যবসায়ী ৩০ থেকে ৬০ টাকায় কেনা খাসির চামড়া বিক্রি করেছেন মাত্র ৫ থেকে ২০ টাকায়। আবার অনেক জায়গায় ক্রেতা না থাকায় চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

মৌসুমি ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সকাল থেকে গ্রামে গ্রামে ঘুরে চামড়া কিনেছি। ভাবছিলাম কিছু লাভ হবে। কিন্তু আড়তে এসে দেখি দাম অর্ধেকেরও কম। গাড়িভাড়া, শ্রমিক খরচ দিয়েই সব শেষ। এবার বড় ক্ষতি হয়ে গেল।’

ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ‘চামড়া কিনে এনে আড়তে বসে থাকতে হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কেউ কিনতে চায় না। যেটা ৫০০ টাকায় কিনেছি, সেটা ২০০ টাকাতেও নিতে চায়নি। এমন অবস্থা আগে কখনো দেখিনি।’

চামড়া ব্যবসায়ী ছানোয়ার হোসেন ছানা বলেন, ‘ট্যানারির মালিকরা আগের পাওনা টাকা পরিশোধ করছে না। তাই বড় ব্যবসায়ীরাও এবার চামড়া কিনতে ভয় পাচ্ছেন।’ 

আব্দুল জলিল নামে আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘লবণের দাম বেড়েছে, শ্রমিক খরচ বেড়েছে, গাড়িভাড়া বেড়েছে। কিন্তু চামড়ার দাম কমেছে। এভাবে ব্যবসা চালানো অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।’

স্থানীয় আড়তদারদের ভাষ্য, ঢাকার ট্যানারিগুলোর কাছে কোটি কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। সেই অর্থ সময়মতো পরিশোধ না হওয়ায় বাজারে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণে লবণের দাম বৃদ্ধি, গুদাম খরচ ও শ্রমিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা বড় ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

আরাফাত নগরের চামড়ার আড়তদার বুলু মিয়া বলেন, ‘চামড়া কিনে সংরক্ষণ করতেই এখন অনেক খরচ। ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে সময়মতো টাকা পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়েই কম দামে কিনতে হচ্ছে।’

জানা গেছে, সাধারণত ১২ থেকে ১৬ বর্গফুটের চামড়াকে ছোট, ১৭ থেকে ২২ বর্গফুটকে মাঝারি এবং ২৩ বর্গফুটের বেশি হলে বড় চামড়া হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এবার আকারভেদেও দামের খুব একটা পার্থক্য দেখা যায়নি। বড় গরুর চামড়াও অনেক জায়গায় ৫০০ টাকার নিচে বিক্রি হয়েছে।

চামড়া ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘গবাদিপশুর ল্যাম্পি স্কিন রোগের কারণে অনেক পশুর চামড়ার মান নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু এই অজুহাতে ইচ্ছাকৃতভাবে দাম কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’

জেলা শহরের কয়েকটি মাদরাসা ও এতিমখানার দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানান, আগে কোরবানির চামড়া বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানের বছরের বড় একটি খরচ মেটানো যেত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে চামড়ার বাজার ধসে পড়ায় সেই আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে এতিমখানা ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও আর্থিক সংকটে পড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়নে কার্যকর তদারকি না থাকা, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া অর্থ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা, বাজার নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং সিন্ডিকেটের কারণেই প্রতি বছর ঈদের চামড়ার বাজারে একই সংকট তৈরি হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে চামড়া খাত আরো বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা।

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন