• ঢাকা
  • শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

স্বপ্নের ঘরে দুঃস্বপ্নের জীবন


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২:৪৯ এএম;
স্বপ্নের ঘরে দুঃস্বপ্নের জীবন

► ঘর আছে, মানুষ নেই ► কোথাও ভাঙা ঘর কোথাও সচ্ছলদের দখল ► কোথাও বসে মদ জুয়ার আড্ডা ► বিক্রিও হচ্ছে সরকারি ঘর

নিজের কোনো ভিটেমাটি নেই। তবু সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি ঘরও জোটেনি ভ্রাম্যমাণ সবজি বিক্রেতা নুরুন্নবীর। বগুড়া সদরের শেখেরকোলা নয়াপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে তিনি এখন থাকছেন অন্যের বরাদ্দ পাওয়া ঘরে। যে ঘরের প্রকৃত মালিক শহিদুলের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে অন্যত্র। তাই নুরুন্নবীকে থাকতে দিয়ে নিজের বাড়িতেই বসবাস করছেন তিনি। একই প্রকল্পে আরও কয়েকটি ঘর দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। অথচ প্রকৃত ভূমিহীনরা ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে। দেশের গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ ছিল আশ্রয়ণ প্রকল্প। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, অনেক জায়গায় সেই প্রকল্প এখন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দখলবাণিজ্যের চিত্রে পরিণত হয়েছে। কোথাও বরাদ্দ পাওয়া লোকজন থাকছেন না, কোথাও ঘর বিক্রি বা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও নির্মাণ ত্রুটি ও পরিবেশগত সমস্যায় ঘরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। চুরি হয়ে গেছে নলকূপসহ প্রয়োজনীয় নানা উপকরণ। ফলে হাজার হাজার সরকারি ঘর খালি পড়ে থাকছে বছরের পর বছর। বাংলাদেশ প্রতিদিনের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের স্বপ্নের ঘরে দুঃস্বপ্নের জীবনের করুণ চিত্র। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুর এলাকায় তিনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৫৭টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হলেও অধিকাংশ ঘরেই এখন তালা ঝুলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে এমন লোকদের ঘর দেওয়া হয়েছে যাদের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে। ফলে তারা সরকারি ঘরে না থেকে আত্মীয়স্বজনকে থাকতে দিচ্ছেন অথবা ঘর ফাঁকা রেখেছেন। মরিয়ম নামে এক নারী জানান, তার নামে কোনো বরাদ্দ নেই। স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির সহায়তায় তিনি পাঁচ বছর ধরে একটি খালি ঘরে থাকছেন। তিনি বলেন, ‘আসল মালিককে কোনোদিন দেখিনি।’ নওগাঁর রাণীনগরের মালিপুকুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে দেখা গেছে আরও ভয়াবহ চিত্র। গৃহহীনদের জন্য দেওয়া সরকারি ঘর সেখানে প্রকাশ্যে কেনাবেচা হচ্ছে। ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় একাধিক ঘর হাতবদলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ঘর একাধিকবার বিক্রিও হয়েছে। সরকারি ঘর কিনে সেখানে বিলাসবহুল সাজসজ্জা করে বসবাস করছেন কেউ কেউ। স্থানীয়দের দাবি, ৩২টি ঘরের মধ্যে অন্তত ১২টি ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। নড়াইলের কালিয়া উপজেলার আটঘরিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধিকাংশ ঘর এখন বসবাসের অনুপযোগী। জরাজীর্ণ বেড়া, নষ্ট ছাউনি, জলাবদ্ধতা ও নিরাপত্তাহীনতায় বাসিন্দারা ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ১৮টি ঘরের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৫টিতে মানুষ বসবাস করছে। বাসিন্দা আসলাম শেখ সুদে টাকা এনে নিজের ঘর সংস্কার করে কোনোভাবে টিকে আছেন। অন্যদিকে প্রকল্পের একাধিক ঘর সচ্ছল পরিবারের দখলে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ঘর আবার ভাড়াও দেওয়া হয়েছে।

বরিশালের চরবাড়িয়া ও চরআবদানী এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোতেও একই চিত্র। ৬০টি ঘরের মধ্যে প্রায় অর্ধেক খালি। বর্ষায় চার-পাঁচ ফুট পানিতে তলিয়ে যায় পুরো এলাকা। নীরু বেগম নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘এখানে থাকতে হলে আলাদা করে টাকা খরচ করে ঘর ঠিক করতে হয়।’ অথচ একই প্রকল্পে টিনের ঘর ভেঙে পাকা ভবন নির্মাণ করেছেন কয়েকজন সচ্ছল ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসনের গাড়িচালকসহ প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যরাও ঘর পেয়েছেন।

গাজীপুরের আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোতে ভিন্ন ধরনের সংকট দেখা গেছে। সেখানে অনেক বাসিন্দা কাজের সন্ধানে শহরে চলে যান। ফলে দিনের বেলা বহু ঘর তালাবদ্ধ দেখা যায়। গাজীপুর সদর উপজেলার ফাওকাল আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা রহিমা বলেন, ‘এখানে থাকার জায়গা আছে, কিন্তু কাজ নেই। তাই শহরে গিয়ে কাজ করতে হয়।’ অন্যদিকে চতর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা জানান, বৃষ্টি হলে ঘরে পানি ঢোকে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর, আর বহু ঘরের নামজারি এখনো হয়নি। বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। শেরপুর উপজেলার খানপুর বুড়িগাড়ি এলাকায় ২২টি আধাপাকা ঘর নির্মাণের পর বৃষ্টিতেই কয়েকটি দেয়াল ধসে পড়ে। উপকারভোগীদের অভিযোগ, নিম্নমানের ইট, বালু ও রড ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি ঘরের কাজ ঠিকমতো করতে অনেকের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা ও নির্মাণসামগ্রী নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বহু প্রকল্প এখন মাদকসেবী ও বখাটেদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। মানিকগঞ্জ ও বরিশালের কয়েকটি প্রকল্পে রাতে জুয়া ও মাদকসেবনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। খালি ঘর থাকায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন প্রকৃত বাসিন্দারা। জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ইউএনও মৌসুমী নাসরিন বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান জানান, আশ্রয়ণ ঘর কেনাবেচার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রকৃত ভূমিহীন শনাক্তে যথাযথ যাচাইবাছাই হয়নি। আবার কোথাও কর্মসংস্থানের সুযোগ, টেকসই অবকাঠামো ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় মানুষ সেখানে টিকতে পারছে না। ফলে গৃহহীনদের জন্য নির্মিত বহু ঘর এখন তালাবদ্ধ, বেদখল কিংবা ধ্বংসের মুখে। সরকারের মানবিক উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে কার্যকর নজরদারি না বাড়ালে আশ্রয়ণের এই স্বপ্ন আরও বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে।

 

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন