• ঢাকা
  • সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২

Advertise your products here

  1. জাতীয়

ঐতিহ্যের শহর বাকেরগঞ্জ: জেলা থেকে উপজেলা: ইতিহাস,অবহেলা ও সম্ভাবনার গল্প।।


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৭:০৯ পিএম;
ঐতিহ্যের শহর বাকেরগঞ্জ: জেলা থেকে উপজেলা: ইতিহাস,অবহেলা ও সম্ভাবনার গল্প

নজরুল ইসলাম আলীম:

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন অনেক জনপদের নাম আছে, যেগুলো এক সময় প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সময়ের পরিবর্তনে তাদের গুরুত্ব কমে গেছে। তেমনই একটি ঐতিহাসিক জনপদের নাম বাকেরগঞ্জ। একসময় যে বাকেরগঞ্জ ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ জেলা, আজ সেটি কেবল একটি উপজেলার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ইতিহাস, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং স্থানীয় পর্যায়ের কিছু অবহেলার বাস্তবতা।ঐতিহাসিকভাবে বাকেরগঞ্জ দক্ষিণ বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত বাকেরগঞ্জ জেলা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। এই জেলার অধীনে বিস্তৃত ছিল বরিশালসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। নদী-খালবেষ্টিত এই জনপদ কৃষি, বাণিজ্য এবং নদীপথ যোগাযোগের কারণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত।বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জেলার নাম ও কাঠামো পরিবর্তন করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ঐতিহাসিক বাকেরগঞ্জ জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র ধীরে ধীরে বরিশালে স্থানান্তরিত হয় এবং পরবর্তীতে জেলা পরিচয়টি বরিশাল নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে একসময়কার জেলা বাকেরগঞ্জ ক্রমান্বয়ে একটি উপজেলায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।তবে ইতিহাসের পাতায় বাকেরগঞ্জের গুরুত্ব আজও অম্লান। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৮১ সালের ২৭ এপ্রিলের একটি ঐতিহাসিক ঘটনায়। সেদিন বাংলাদেশের তৎকালীন মহামান্য রাষ্ট্রপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান বাকেরগঞ্জ জেলায় খাল খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন। দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য সেই উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে সেই সময়েও বাকেরগঞ্জ প্রশাসনিক ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত ছিল।কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতা বদলেছে। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের অভাব,ঐতিহ্য সংরক্ষণে অনাগ্রহ এবং পরিকল্পিত দাবি উত্থাপনের ঘাটতির কারণে বাকেরগঞ্জের জেলা পরিচয় পুনরুদ্ধারের আলোচনা তেমনভাবে সামনে আসেনি। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ইতিহাসের গৌরব তখনই টিকে থাকে যখন একটি অঞ্চলের মানুষ সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করে এবং তা সংরক্ষণের জন্য সচেতন ভূমিকা পালন করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাকেরগঞ্জ নামটি এখনো বিভিন্ন সরকারি ও ঐতিহাসিক নথিপত্রে জেলা হিসেবে উল্লেখ পাওয়া যায়। গবেষণা, ইতিহাসচর্চা এবং প্রশাসনিক দলিলপত্রে এই নামটি দক্ষিণ বাংলার ঐতিহাসিক পরিচয়ের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। অর্থাৎ প্রশাসনিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এলেও ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বাকেরগঞ্জের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।আজকের প্রজন্মের জন্য প্রয়োজন ইতিহাসকে নতুনভাবে অনুধাবন করা। বাকেরগঞ্জের ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং অবদানকে সামনে এনে গবেষণা, লেখালেখি ও জনসচেতনতার মাধ্যমে এই জনপদের মর্যাদা তুলে ধরা জরুরি। কারণ একটি অঞ্চলের পরিচয় শুধু প্রশাসনিক মানচিত্রে নির্ধারিত হয় না—তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের স্মৃতিতেও তা বেঁচে থাকে।বাকেরগঞ্জের ইতিহাস তাই কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বরং এটি একটি শিক্ষা। শিক্ষা এই যে—যে অঞ্চল তার ইতিহাসকে স্মরণ করে, ঐক্যবদ্ধভাবে তার দাবি তুলে ধরে, সেই অঞ্চলই ভবিষ্যতের পথ নির্মাণ করতে পারে। আর সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই বলা যায়, বাকেরগঞ্জের ইতিহাস এখনো শেষ হয়ে যায়নি; বরং নতুনভাবে মূল্যায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন