• ঢাকা
  • সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৬ চৈত্র ১৪৩২

Advertise your products here

  1. জাতীয়

‎ডিএনসিসি'র টেন্ডার কেলেঙ্কারি: পিপিআর আইনে তুড়ি মেরে ৩১ কোটি টাকার কাজ ‘লুট’!


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০:৫৭ এএম;
‎ডিএনসিসি'র টেন্ডার কেলেঙ্কারি পিপিআর আইনে তুড়ি মেরে ৩১ কোটি টাকার কাজ ‘লুট’!

‎ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) অঞ্চল-৬ (উত্তরা) এখন অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকারি ক্রয়ের (পিপিআর) নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এলাকার সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) লঙ্ঘন করে পছন্দের ঠিকাদারদের পকেটে প্রায় ৩১ কোটি ৪৩ লাখ টাকার উন্নয়ন কাজ তুলে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

আর এই অনিয়ম ও দুর্নীতির ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে আঙুল উঠেছে খোদ অঞ্চল-৬ এর নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশীদের দিকে।তথ্য সূত্র বলছে যোগ্যতাকে  আঙুল দেখিয়ে যেভাবে বাগানো হয়েছে কাজ তা হলো ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের একটি মেগা প্রকল্পে দরপত্র আহ্বান করা হয়।দরপত্রে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো অংশগ্রহণ করার নিয়ম থাকলেও সূত্র বলছে প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতার ঝুলি শূন্য থাকা সত্ত্বেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় কাজ পেয়েছে ৫টি বিশেষ সিন্ডিকেট। তথ্য গোপন করে  ৪ কোটি ১৩ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে এসএম রহমান ইন্টারন্যাশনাল যাহার (আইডি নং-১০৯৫২২৯), যারা তাদের চলমান কাজের তথ্য পুরোপুরি গোপন করেছে।অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশীদ সবকিছু জেনেও প্রতিষ্ঠানটির ফাইল ছেড়ে দিয়েছেন।

‎টেন্ডার শর্তের ‘বারোটা’ বাজিয়ে  সাবরিনা ও রাইফ এন্টারপ্রাইজ (আইডি নং-১১১০৭৩৭) যৌথভাবে ৭ কোটি ১৪ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। অথচ পিপিআর অনুযায়ী তাদের ৩৫ কোটি টাকার বার্ষিক টার্নওভার ও ৩ কোটি টাকার সমজাতীয় কাজের অভিজ্ঞতা থাকার কথা থাকলেও তা ছিল না বলে তথ্য সূত্র জানান।শর্ত লঙ্ঘন করে ‎অসম্ভবকে সম্ভব করা মোল্লা এন্টারপ্রাইজ (আইডি-১১০৬৯৩২) ৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে কোনো প্রকার ৬০ কোটি টাকার টার্নওভার বা ৬ কোটি টাকার অভিজ্ঞতা ছাড়াই। একইভাবে সঞ্জীব এন্টারপ্রাইজ(আইডি নং- ১১৪৮৯৫০) আইজা ও এমএস লরিন এন্টারপ্রাইজ ( আইডি নং-১১৪৫৩৩৯)সিন্ডিকেটও শর্ত পূরণ না করে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকার কার্যাদেশ।

‎একটি বিশ্বাসযোগ্য সূত্র জানায় অঞ্চল- ৬ এর পিয়ন ফারুক এর মাধ্যমে এসব ঠিকাদার সিন্ডিকেট কাজ পাওয়ার চুক্তি সম্পন্ন করে।একজন ঠিকাদার বলছেন,ফারুকের সাথে সুবিধা আকাঙ্ক্ষা ঠিক হলেই অনিয়ম নিয়মে পরিণত হয়।আর এই অনিয়মের জন্য ফারুকের মাধ্যমে অর্থ লেননের চুক্তির বিনিময়ে (পিপিআর ) আইন অমান্য করে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হচ্ছে।ডিএনসিসি'র এক সূত্রে জানা যায়,ফারুক নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ এর অতিরিক্ত উপার্জনের একমাত্র আস্থাভাজন।সেই সাথে তিনি এখন কার্য সহকারী'র হিসেবে কাজ করছেন।নিয়ম অনুযায়ী একটি ওয়ার্ডের জন্য একজন কার্য সহকারী থাকলেও নির্বাহী প্রকৌশলী'র আস্থাভাজন হিসেবে তিনি একাই দুটি ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করছেন। আর দুটি ওয়ার্ডের একক দায়িত্ব পেয়ে তিনি এতোটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন যে কাজ বাড়াইলে লুটপাট করতে সুবিধা হয় এমন উদাহরণ তিনি রেখেছেন।

সেই উদাহরণ সরূপ বলতে গেলে পপুলার এর একটি রাস্তা যেটা ডিএনসিসির করার কথা নয় সেটাও তিনি করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে ব্যবহৃত রোলার মেশিন ঠিকাদারদের কাছে ভাড়া  দেওয়া হলেও মেশিনের ভাড়া বাবদ কোন অর্থ কোষাগারে জমা না দিয়ে লুটপাট হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।আর এই কারসাজি করা হচ্ছে হচ্ছে বড় বাবু নামে একটি পদবীর সাক্ষর জাল করে।দাপ্তরিক কাজের কাগজে- কলমে বিলের রশিদে বড় বাবুর সাক্ষর প্রয়োজন হয়।এই পদে একজন নারী সদস্য থাকলেও লুটপাটের উদ্দেশ্যে সকল সাক্ষর নাকি কার্য সহকারী ফারুক করে থাকে।আর এমন ভাবেই কাজ বাস্তবায়নে কোটি কোটি টাকার ফাকফোকরে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তিনি কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।উত্তরার একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে বসবাস করেন।প্রায় পাঁচ কোটি টাকার জমি ক্রয় করেছেন।নামে -বেনামে আরো অনেক কিছু রয়েছে বলে সূত্র বলছে।এমন অভিযোগের সত্যতা জানতে ফারুক এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,কাজগুলো সব নির্বাহী প্রকৌশলী' ও ব্রিগেডিয়ার স্যার দেয়।তার আয় বহির্ভূত সম্পদের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। 

‎ডিএনসিসি'র ঠিকাদার মহল জানায়,গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে প্রভাব খাটিয়ে ও বিভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে এই টেন্ডারগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। অভিযোগ আছে, শুধু এই প্রকল্প নয়, অঞ্চল-৬ এর অন্যান্য দাপ্তরিক কাজেও নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।সব তথ্য-প্রমাণ সামনে আসার পরও নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশীদ তার দায় এড়ানোর চেষ্টা করবেন এমটাই ধারণা করছেন অনেকেই।আর তেমনটিই ঘটলে তার বক্তব্য জানতে গিয়ে।তিনি দাবি করেছেন, "আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।" তবে প্রতিবেদকের প্রশ্নের মুখে তিনি তথ্য অধিকার আইনের দোহাই দেন এবং অবাক করার মতো বিষয় হলো, সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য তিনি ‘সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার’ দোহাই দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ না করার মৌখিক অনুরোধ জানান।

‎এই ঘটনায় ডিএনসিসির অভ্যন্তরে ও সৎ ঠিকাদারদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। নিয়ম মেনে দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, পিপিআর অনুযায়ী টেন্ডার ক্যাপাসিটি ও অভিজ্ঞতা না থাকলে কোনোভাবেই যোগ্য হওয়ার সুযোগ নেই। এখানে সরাসরি পিপিআর আইনের লঙ্ঘন হয়েছে।‎ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের করণীয় নিয়ে ‎নগর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিশাল অঙ্কের টেন্ডার জালিয়াতির পেছনে কোনো গভীর সিন্ডিকেট কাজ করছে কি না, তা বের করতে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে সরকারি কোষাগারের অর্থে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোতে  এই অপচয়  ও অনিয়ম কখনোই বন্ধ হবে না।

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন