ওয়ারিশ সনদ নিতে জজ কোর্টের চক্কর, মনোহরদী পৌরসভার নিয়মে ভোগান্তিতে নাগরিকরা
* ৫ই আগস্টের পর সাবেক প্রশাসকের চালু করা নিয়মে বন্দি সেবাগ্রহীতারা
* স্থানীয় তদন্ত বাদ দিয়ে জেলা সদরে পাঠানোর পেছনে ‘প্রশাসনিক দায় এড়ানোর’ কৌশল
* আইনজীবী ফি ও যাতায়াত খরচে নিঃস্ব সাধারণ মানুষ; সমাধানের বদলে পুরোনো পথেই হাঁটার সাফাই বর্তমান ইউএনওর
ক্রাইম রিপোর্টার:
উত্তরাধিকার বা ওয়ারিশ সনদ পাওয়ার স্বাভাবিক নিয়ম স্থানীয় পৌরসভার মাধ্যমে সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করে দ্রুত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। অথচ নরসিংদীর মনোহরদী পৌরসভায় সেবাটি নিতে গিয়ে এক অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানি ও চরম আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন সাধারণ জনগণ। স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই করার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পৌর কর্তৃপক্ষের এক অদ্ভুত নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে আবেদনকারীদের ছুটতে হচ্ছে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের নরসিংদী জেলা জজ কোর্টে। একজন অ্যাডভোকেটের মাধ্যমে জজ কোর্ট থেকে স্ট্যাম্পভিত্তিক হলফনামা (অ্যাফিডেভিট) সংগ্রহের নামে সময়, শ্রম ও অতিরিক্ত অর্থ খুয়াচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তৎকালীন মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক মুহাইমিন আল জিহান এই জেলা কোর্টের হলফনামা বাধ্যতামূলক করার নিয়মটি চালু করেন। তবে সরকার ও প্রশাসনের পরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের ঘাড় চেপে বসা সেই ভোগান্তির নিয়মটি আজও বহাল রয়েছে। মনোহরদী পৌরসভা থেকে একটি ওয়ারিশ সনদ তোলার প্রাথমিক শর্ত হিসেবেই নরসিংদী জেলা জজ কোর্টের হলফনামা জমা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর ফলে আইনজীবী ফি, স্ট্যাম্পের দাম ও নরসিংদী যাতায়াত ভাড়া মিলিয়ে প্রতিটি সনদের পেছনে গুণতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা, যা সাধারণ ও অসচ্ছল পরিবারের জন্য এক বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ওয়ারিশদের সঠিকভাবে সনাক্ত করার সবচেয়ে কার্যকরী ও নির্ভুল মাধ্যম হলো স্থানীয় সামাজিক তদন্ত। পৌরসভার ওয়ার্ড সচিব, গ্রাম পুলিশ বা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সরেজমিনে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বললেই প্রকৃত ওয়ারিশ চেনা সম্ভব। অথচ সেই স্থানীয় তদন্ত জোরদার না করে সবাইকে নরসিংদী জেলা জজ কোর্টে পাঠানোর মাধ্যমে প্রতারণা রোধের চেয়ে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তিই বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে।
সাবেক প্রশাসকের চালু করা এই বিতর্কিত নিয়মটি এখনো কেন বলবৎ রাখা হয়েছে—এমন প্রশ্নে বর্তমান মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক জনাব মাহমুদুল হাসান জানান, জালিয়াতি ঠেকাতেই এই আইনি প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “অনেক সময় দেখা যায় একটি পরিবারে পাঁচজন ওয়ারিশ থাকলে ১-২ জনকে বাদ দিয়ে তথ্য গোপন করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সনদ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে এ নিয়ে চরম আইনি জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তাই এসব জটিলতা এড়াতেই জজ কোর্টের হলফনামা চাওয়া হচ্ছে।”
তবে অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে দেখা গেছে, নরসিংদী জজ কোর্টে গিয়ে আইনজীবীদের মাধ্যমে তৈরি করা হলফনামায় মাঠপর্যায়ের বা সরজমিনের কোনো তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না। আইনজীবীরা কেবল আবেদনকারীর দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই হলফনামা তৈরি করেন। ফলে আসল তথ্য গোপনের সুযোগ থেকেই যায়।
জেলা শহরের একজন আইনজীবী কীভাবে আবেদনকারীর সঠিক ওয়ারিশ চিহ্নিত করছেন এবং এতে জালিয়াতি কতটা ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে বর্তমান পৌর প্রশাসক সরাসরি স্বীকার না করলেও তার বক্তব্যে উঠে আসে প্রশাসনিক দায় এড়ানোর চিত্র। তিনি জানান, “যেহেতু হলফনামাটি আদালতের মাধ্যমে করা হচ্ছে, তাই পরবর্তীতে কেউ তথ্য গোপন করলে তার আইনি দায়ভার সম্পূর্ণ আবেদনকারী ও সত্যায়নকারীর ওপরই বর্তাবে।”
প্রশাসনের এমন বক্তব্যকে ভুক্তভোগী ও আইন বিশেষজ্ঞরা দেখছেন ‘আইনি দায় এড়ানোর কৌশল’ হিসেবে। তাদের মতে, কোনো আবেদনকারী মিথ্যা তথ্য দিলে ফৌজদারি আইনে তার বিচার ও সনদ বাতিলের সুস্পষ্ট বিধান রেখে পৌরসভার নিজস্ব অঙ্গীকারনামা (Form of Undertaking) এবং স্থানীয় তদন্তের মাধ্যমে সেবা চালু রাখা সম্ভব।
কিন্তু জালিয়াতি ঠেকানোর দোহাই দিয়ে দায় এড়াতে সাধারণ জনগণকে জেলা সদরে পাঠানোর ফলে নাগরিক সেবা এখন এক প্রকার শাস্তিতে পরিণত হয়েছে।
মনোহরদী পৌরসভার অধিবাসীরা প্রশাসনিক এই জটিলতা কাটিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ওয়ারিশ সনদ প্রদানের জন্য জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দাবি করছেন।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: