'দুর্ব্যবহারের ঘটনা' আড়াল করতেই এএসপিকে জড়িয়ে বিভ্রান্তিকর অভিযোগ আনে বাসচালক
টিকিট অনিয়ম ও যাত্রীদের গালিগালাজ:
নওগাঁয় স্বামীর সঙ্গে তর্কের জেরে সহকারী পুলিশ সুপারের (সাপাহার সার্কেল) কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে বাসচালকের মারধরের অভিযোগ উঠেছে সহকারী পুলিশ সুপার (সাপাহার সার্কেল) শ্যামলী রানী বর্মণের বিরুদ্ধে। তবে খোঁজ নিয়ে গেছে, হিমাচল পরিবহনের ওই বাসটিতে টিকিট অনিয়ম ও যাত্রীদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহারের ফলে এএসপি অফিসে চালক বাদলকে ডেকে নেওয়া হলেও সেখানে কোনো মারধোরের ঘটনা ঘটেনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাসের অনিয়ম ও যাত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের বিষয়টি আড়াল করতেই বাসচালক সংবাদমাধ্যমে নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর অভিযোগ করেন। এ ঘটনার নেপথ্যে একজন শ্রমিক নেতা নামও সামনে এসেছে। যিনি হিমাচল বাসের মালিক বলে জানা গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত রবিবার(০৪ জানুয়ারি) সকালে। সেদিন রাজশাহীগামী হিমাচল পরিবহনের একটি বাস সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সাপাহার বাসস্ট্যান্ড ত্যাগ করে। ওই বাসে যাত্রী হয়ে ধানসুরা নামার উদ্দেশ্যে উঠেছিলেন শ্যামলী রানী বর্মণের স্বামী কলেজ শিক্ষক জয়ন্ত বর্মণ।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সেদিন বাসে থাকা একাধিক যাত্রী জানান, বাস ছাড়ার আগেই নির্ধারিত সিটের চেয়ে বেশি যাত্রী তোলা হয় এবং একই সিট একাধিক যাত্রীর কাছে বিক্রি করা হয়।
জানা যায়, বাসের আই-৩ ও আই-৪ নম্বর সিট দুইটি চারজন যাত্রীর কাছে বিক্রি করা হয়। সাপাহার থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার যাওয়ার পর নতুন যাত্রী বাসে ওঠে এবং ওই সিট দাবি করলে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা। এ সময় বাসের সুপারভাইজার সিয়াম এক বয়স্ক যাত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত রূঢ় ও অশালীন আচরণ করেন।
সেদিন বাসটিতে থাকা এক যাত্রী জানান, সিট না থাকায় কলেজ শিক্ষক জয়ন্ত বর্মণ বাসের একেবারে পেছনের ফাঁকা সিটে বসেন। সাপাহার থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার যাওয়ার পর আরও দুই যাত্রী উঠে একই সিট দাবি করলে বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ সময় হেল্পার ও সুপারভাইজার ওই সিটে বসা এক বয়স্ক যাত্রীর সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে তাকে উঠে যেতে বলেন। পরে দেখা যায়, একই সিট একাধিক যাত্রীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে। তখন সুপারভাইজার টিকিটের অজুহাতে জয়ন্ত বর্মণের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং তাকে সিট ছাড়তে বলেন। ভদ্রভাবে কথা বলার অনুরোধ জানালেও সুপারভাইজার উচ্চস্বরে কথা বলতে থাকেন ও অশালীন ভাষায় হুমকি দেন।
জয়ন্ত বর্মণ বাস থেকে নামার সময় চালক বাদলকে সুপারভাইজারের আচরণ ঠিক করার অনুরোধ করলে চালকও উল্টো তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং টিকিট না থাকার অভিযোগ তুলে বাস থামিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।
বাসযাত্রী নাসির উদ্দিন বলেন, আমার জীবনে অনেক বাসে উঠেছি, কিন্তু এমন ব্যবহার দেখিনি। বয়স্ক মানুষটাকে যেভাবে ধমকানো হচ্ছিল, সেটা দেখে আমরা সবাই বিব্রত হয়েছিলাম।
তিনি জানান, চালক বাদলও এ সময় সুপারভাইজারের পক্ষ নিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং বাস থামিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।
এদিকে স্বামী জয়ন্ত বর্মণের সঙ্গে এমন ঘটনার পর সাপাহার সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার শ্যামলী রানী বর্মণের কার্যালয় থেকে ওই বাসের চালক ও সুপারভাইজারকে ডাকা হয়। চালক বাদল অফিসে উপস্থিত হয়ে নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চান। তবে অভিযুক্ত সুপারভাইজার সিয়াম অফিসে হাজির হয়নি।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, অফিসে কোনো ধরনের মারধরের ঘটনা ঘটেনি। বরং বাসে টিকিট অনিয়ম ও যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে পরবর্তীতে চালক পক্ষ থেকে মারধরের গল্প ছড়ানো হয়।
এ বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার শ্যামলী রানী বর্মণ বলেন, কোন নির্দোষ ব্যক্তিকে মারাতো দূরের কথা, আমি আসামীর গায়েও হাত দিতে দেইনি কখনো। বাসে যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও টিকিট অনিয়মের অভিযোগে চালক ও সুপারভাইজারকে ডাকা হয়েছিল। চালক ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন। কোনো মারধরের ঘটনা ঘটেনি। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছে এএসপির বিরুদ্ধে মারধরের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। গণপরিবহনে অনিয়ম ও যাত্রী হয়রানির বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সবশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নওগাঁ জেলা পুলিশ।
দৈনিক পুনরুত্থান / নিজস্ব প্রতিবেদক, নওগাঁ
- বিষয়:
- দুর্ব্যবহারের ঘটনা
- এএসপি
- বাসচালক
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: