বাজেটে সুবিধা না পেলে দ্বিগুণ হবে মুরগির দাম
করপোরেট কর ১৫ থেকে ২৭.৫ শতাংশ বৃদ্ধিসহ সব ধরনের শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়ায় চাপে পড়েছেন প্রান্তিক খামারিরা। গত পাঁচ বছরে পোলট্রি খাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় বেড়েছে চলতি বছরে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে তৃণমূল খামারে। ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের অঙ্ক না মেলায় অনেকেই খামার বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। এতে বেকার হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার খামারি। ফলে দেশে এই প্রান্তিক শিল্পে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ পড়েছে খাদের কিনারে। তাই বাজেটে শুল্ক ও কর সুবিধা না দিলে করপোরেট কোম্পানির দখলে চলে যাবে বাজার। দ্বিগুণেরও বেশি বাড়বে ডিম ও মুরগির দাম। এতে কম দামে সাধারণ মানুষের প্রোটিনের শেষ উৎসও হারিয়ে যাবে। বুধবার খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ঈদের পর খুচরা বাজারে যে ব্রয়লার মুরগির কেজি ছিল ১৮০ টাকা। তা এখন ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি কেজিতে ১০০ টাকা বাড়িয়ে সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৪২০ টাকা। ৬৫০ টাকার দেশি মুরগি ৮০০ টাকায় ঠেকেছে। সঙ্গে ২০০ টাকা কেজির নিচে মিলছে না কোনো মাছ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও পোলট্রি খাতের সংগঠন ও খামারিদের দেওয়া তথ্যেমতে, গত পাঁচ বছরে উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কমেছে প্রবৃদ্ধি হার। ২০২১ সালে প্রবৃদ্ধির হার ৪.৫ শতাংশ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ১০০ শতাংশ ভিত্তি ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, ২০২২ সালে প্রবৃদ্ধি হার ৫.২ শতাংশ হয়েছে এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৫ শতাংশ। পাশাপাশি ২০২৩ সালে প্রবৃদ্ধি হার ৩.৮ শতাংশ হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ১৪৫ শতাংশ। সঙ্গে ২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধির হার ৩.৫ শতাংশ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ১৭০ শতাংশ। আর ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধির হার ৩.২ শতাংশ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ১৯০ শতাংশ। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, গত ৫ বছর ধরে নানা চড়াই-উতরাই পার করে পোলট্রি শিল্প টিকে আছে। করোনা পরবর্তী বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের এই খাতকে আরও বেশি দুর্বিষহ করে তুলেছে। এরপর চলতি বছরে প্রায় দ্বিগুণ কর ও শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫ শতাংশ করা হয়েছে। যা একেবারেই অযৌক্তিক। এআইটি ১ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। টার্নওভার কর ০.৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। এভাবে আমাদের ওপর গত বছর করের বোঝা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর প্রভাব কিন্তু সরাসরি তৃণমূল খামারিদের ওপর গিয়ে পড়েছে। খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম, মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে। মাসের পর মাস লোকসানের ঘানি টানছেন লাখ লাখ খামারি।
তিনি জানান, এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত রয়েছে। যাদের বড় একটি অংশ তরুণ উদ্যোক্তা। খামার বন্ধ হলে এই বিশাল সংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান হারাবেন। এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ধস নামবে। পাশাপাশি বিশ্বের কোথাও খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কোনো খাতের সঙ্গে এত উচ্চ কর নেই। বরং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কর অব্যাহতি দিয়ে উদ্যোক্তা ও খামারিদের সহায়তা দিচ্ছে। অথচ কৃষিপ্রধান দেশ হিসাবে আমরা উলটোটা করছি। এটার প্রভাব কিন্তু ইতোমধ্যে উৎপাদনকারীদের ওপর পড়া শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে এই প্রভাব বাজার ও ভোক্তাদের ওপর পড়বে। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের সুরক্ষা এবং পোলট্রি শিল্পকে এগিয়ে নিতে বর্তমানের কর ও শুল্ক অর্ধেকে নামিয়ে নিয়ে আসা জরুরি। নইলে প্রান্তিক খামারিদের আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। আর প্রান্তিক খামারি না থাকলে এ শিল্প পুরোটাই বড় করপোরেট কোম্পানির অধীনে চলে যাবে। তখন ওইসব করপোরেট কোম্পানির বেঁধে দেওয়া দামেই ভোক্তাদের মাছ, ডিম, মুরগি ও মাংস কিনে খেতে হবে।
দুই যুগের বেশি সময় ধরে খামার পরিচালনা করছেন টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর উপজেলার প্রান্তিক খামারি আলমগীর হোসেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, গত এক বছরে যেভাবে খাদ্যের দাম বেড়েছে অতীতে এমন কখনো হতে দেখিনি। প্রতিদিন আমিসহ হাজার হাজার খামারি লোকসান গুনছি। উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে আমাদের ডিম, মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে। চোখের সামনে শত শত খামারিকে নিঃস্ব হতে দেখছি। খাদ্যের দাম যদি না কমানো যায় তাহলে প্রান্তিক পর্যায়ের আমরা কোনো খামারিই টিকে থাকতে পারব না। তিনি জানান, বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ হয় সাড়ে ১০-১১ টাকা। অথচ পাইকারি বাজারে অনেক সময় সাড়ে ৭ থেকে সাড়ে ৮ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১৪৬ টাকা। যেখানে পাইকারি পর্যায়ে প্রান্তিক খামারিকে ১৪৫-১৪৮ টাকা বিক্রি করতে হচ্ছে। এই অবস্থায় উৎপাদন খরচ কমানো ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব। তাই এবারের বাজেটে প্রান্তিক খামারিদের জন্য কিছু সুবিধা দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মন্ডল বলেন, পোলট্রি শিল্প বাঁচাতে চাইলে প্রথমে খাদ্যের দাম কমাতে হবে। কেননা খামারির মোট খরচের ৭৫-৮০ শতাংশই হয় খাদ্য কেনায়। কম দামে খামারিদের খাদ্য দিতে হলে খাদ্যের উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। খাদ্য উৎপাদনের উপকরণ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আপনাকে আয়কর ও শুল্ক কমাতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা জরুরি। এর পাশাপাশি দেশীয় খাদ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তা তৈরি করে তাদের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড়সহ নানা সুবিধা দেওয়ার পরামর্শ দেন এই অধ্যাপক।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, চলতি অর্থবছরে পোলট্রি খাতে সব ধরনের কর ও শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। যার প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারকে সব ধরনের কর ও শুল্কে নমনীয় হতে হবে। টার্নওভার কর ০.২ শতাংশে নামিয়ে এনে মোট মুনাফার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এবং করপোরেট ট্যাক্স ১০ শতাংশে নামিয়ে আনলে বড় উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়বে। এআইটি ১ শতাংশ করার পাশাপাশি টাকা ফেরতের জটিলতা নিরসন ও টিডিএস কমানো দরকার।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: