অদম্য লেগে থাকার গল্প: কুষ্টিয়ার নাসিম এখন মাইক্রোসফটে
কুষ্টিয়ার আমলা-সদরপুরের ছেলে মো. নাসিম আল আওয়াল। পরিবার ও শৈশবের বন্ধুদের কাছে তিনি ‘কবি’ নামেই পরিচিত। আজ তিনি জাপানে অবস্থিত মাইক্রোসফটের ডেটা সেন্টারে কাজ করছেন। তবে তাঁর গল্পটা কেবল বিদেশে চাকরি পাওয়ার গল্প নয়; বরং বহুবার প্রত্যাখ্যাত হয়েও থেমে না যাওয়ার গল্প।
সততার শিক্ষা, সীমিত সামর্থ্য
নাসিমের বাবা শিক্ষিত মানুষ। ১৯৯৬ সালে দুর্নীতির সঙ্গে আপস না করে একটি ভালো অবস্থানের চাকরি ছেড়ে দেন। সিদ্ধান্তটি পরিবারের জন্য আর্থিকভাবে কঠিন ছিল, কিন্তু নাসিমের কাছে সেটাই হয়ে ওঠে জীবনের প্রথম বড় শিক্ষা—অবস্থান নয়, আদর্শই বড়।
পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল না। পড়াশোনার খরচ জোগাতে কখনো গরু, কখনো ছাগল, কখনো হাঁস-মুরগি বিক্রি করতে হয়েছে। গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা নাসিম মাঠের কাজেও সাহায্য করতেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে বড় কিছু করার তাগিদ ছিল।
কিশোর বয়সে একবার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। অস্থিরতা আর নিজের মতো করে জীবন গড়ার স্বপ্ন তাকে সেই পথে নিয়ে গিয়েছিল। পরে বুঝেছেন, পালিয়ে নয়—দক্ষতা বাড়িয়েই নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়। সেই উপলব্ধিই তাঁকে আরও মনোযোগী করে তোলে।
মায়ের ছাগল বিক্রি, শেখার দরজা
কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে পড়ার সময় প্রযুক্তির প্রতি তাঁর আগ্রহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু শেখার জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা ছিল না। ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য একটি ডিভাইস কেনার টাকাও জোগাড় হচ্ছিল না। তখন তাঁর মা সংসারের একটি ছাগল বিক্রি করে একটি মোবাইল ফোন কিনে দেন। সেই ফোনই ছিল তাঁর প্রথম “ডিজিটাল দরজা”—মডেম হিসেবে ব্যবহার করে তিনি অনলাইন রিসোর্সে ঢুকতেন, ভিডিও দেখে শিখতেন, ফোরামে প্রশ্ন করতেন।
ছোটবেলা থেকেই গেম খেলতে পছন্দ করতেন নাসিম। তবে তিনি শুধু খেলায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। গেম কীভাবে কাজ করে, নেটওয়ার্ক কীভাবে তৈরি হয়, সার্ভার কীভাবে পরিচালিত হয়—এসব নিয়ে কৌতূহল থেকেই শুরু হয় গভীর আগ্রহ। ধীরে ধীরে অনলাইন কোর্স, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন আর নিয়মিত অনুশীলন হয়ে ওঠে তাঁর দৈনন্দিন অভ্যাস।
বিদেশযাত্রা ও আর্থিক লড়াই
জাপানে কাজের সুযোগ তৈরি হলে সামনে আসে বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ। ভিসা হওয়ার পরও প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা সহজ ছিল না। আত্মীয়স্বজনের কাছে সাহায্য চাইলে অনেকে সংশয়ে ছিলেন—এই বিনিয়োগ আদৌ ফিরে আসবে কি না। শেষ পর্যন্ত খুব কাছের কয়েকজন মানুষ তাঁর পরিশ্রমে বিশ্বাস রাখেন। শ্বশুরবাড়ি থেকেও সহযোগিতা আসে। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ ও ধার করা অর্থ মিলিয়ে যাত্রার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়।
জাপানে এসে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। ভাষা, সংস্কৃতি, কাজের পরিবেশ—সবই ভিন্ন। এর সঙ্গে যোগ হয় চাকরির জন্য ধারাবাহিক আবেদন।
একের পর এক ‘না’
অ্যামাজন, গুগল, অ্যাপল, ওরাকল, আইবিএমসহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেন নাসিম। প্রত্যাখ্যানের মেইল আসতে থাকে। ২০২২ সালে মাইক্রোসফটেও আবেদন করে ব্যর্থ হন। অনেকের জন্য এখানেই থেমে যাওয়ার কারণ যথেষ্ট ছিল।
কিন্তু নাসিম থামেননি। প্রতিটি প্রত্যাখ্যানকে তিনি দেখেছেন শেখার সুযোগ হিসেবে। কোথায় ঘাটতি আছে, কোন দক্ষতা বাড়াতে হবে—সেগুলো চিহ্নিত করে নতুন করে প্রস্তুতি নিয়েছেন। জাপানের অন্যতম বৃহত্তম কোম্পানি টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি NTT Communications-এ দীর্ঘ ৫ বছর ৮ মাস Network Operations Center Engineer হিসেবে কাজের পাশাপাশি প্রায় ৪০টিরও বেশি অনলাইন কোর্স সম্পন্ন করেছেন। ইংরেজি ও জাপানি ভাষায় নিজেকে দক্ষ করে তুলেছেন স্বশিক্ষায়।
অবশেষে পুনরায় আবেদন করে তিনি জাপানে মাইক্রোসফটের ডেটা সেন্টারে কাজের সুযোগ পান।
তরুণদের জন্য বার্তা
নাসিম মনে করেন, বাংলাদেশের তরুণদের মেধার অভাব নেই। প্রয়োজন ধারাবাহিকতা। তাঁর ভাষায়, “আমি অসাধারণ ছাত্র ছিলাম না। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। প্রতিবার ব্যর্থতার পর ভেবেছি—আর কী শেখা দরকার।”
২০২৬ সালের প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতায় তিনি তরুণদের জন্য তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেন—ইংরেজিতে দক্ষতা, কম্পিউটার ও প্রযুক্তি জ্ঞান, এবং সাইবার বিষয়ে মৌলিক ধারণা। তাঁর মতে, এখন আর কেবল ডিগ্রি যথেষ্ট নয়; দক্ষতাই আসল শক্তি।
ভবিষ্যতে দেশের তরুণদের জন্য কাজ করার ইচ্ছা আছে তাঁর। নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান, যেন অন্য কেউ প্রত্যাখ্যানকে শেষ মনে না করে।
কুষ্টিয়ার সেই ‘কবি’ আজও নিজেকে শিক্ষার্থী বলেই পরিচয় দেন। তাঁর বিশ্বাস, লেগে থাকলে পথ একসময় খুলবেই।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: