তথ্য অধিকার আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি? নীরব ইউএনও, ডিসি ও তথ্য কমিশন
স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ বাস্তবে কতটা কার্যকর—মনোহরদীর একটি ঘটনা সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তথ্য না দেওয়া, প্রথম আপিলের নিষ্পত্তি না করা এবং দীর্ঘ সময়েও তথ্য কমিশনের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
প্রাপ্ত নথি অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে স্থানীয় সচেতন নাগরিক এনামুল হক আল-আমিন মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দপ্তরে তথ্য অধিকার আইনের ধারা ৮ ও ৯ অনুযায়ী গত দুই বছরের ১% ভূমি হস্তান্তর কর, এডিপি বরাদ্দ, হাট-বাজার ইজারা, গাড়ি ও জ্বালানি ব্যয়সহ বিভিন্ন উন্নয়ন খাতের আয়-ব্যয়ের হিসাব চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হলেও কোনো তথ্য কিংবা লিখিত সিদ্ধান্ত তাঁকে দেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে তথ্য অধিকার আইনের ধারা ২৪ অনুযায়ী প্রথম আপিল কর্তৃপক্ষ নরসিংদীর জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে নিবন্ধিত ডাকযোগে আপিল করা হয়। প্রাপ্তিস্বীকার থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি বা কোনো শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের নীরবতার পর ১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে তথ্য অধিকার আইনের ধারা ২৫ অনুযায়ী রাজধানীর আগারগাঁওয়ে তথ্য কমিশনে দ্বিতীয় আপিল/অভিযোগ দায়ের করা হয়। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত শুনানির নোটিশ, সিদ্ধান্ত কিংবা কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ পাওয়া যায়নি।
এরই মধ্যে ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে মনোহরদী পৌরসভার সার্বিক রাজস্ব আয়, বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব চেয়ে পৌর প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা ইউএনওর দপ্তরে ফরম-ক অনুযায়ী নতুন আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। আবেদন গ্রহণের সিল দেওয়া হলেও পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার কারণে তথ্যপ্রাপ্তি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আবেদনকারী এনামুল হক আল-আমিন বলেন, "আমি আইন যেভাবে নির্দেশ দিয়েছে, ঠিক সেভাবেই ইউএনও, ডিসি এবং তথ্য কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছি। প্রতিটি আবেদনের প্রাপ্তিস্বীকারপত্র আমার কাছে রয়েছে। কিন্তু কোনো দপ্তর থেকেই আইনি সময়সীমার মধ্যে কোনো কার্যকর সাড়া পাইনি। যদি আইন বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোই নীরব থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ তাদের সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার কীভাবে ভোগ করবে?"
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য প্রদান বা আপিল নিষ্পত্তি না করার ক্ষেত্রে দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জরিমানা ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নিষ্ক্রিয়তা আইনটির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন সৃষ্টি করছে।
মনোহরদীর এই ঘটনাটি শুধু একজন আবেদনকারীর তথ্যপ্রাপ্তির বিষয় নয়; বরং সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং তথ্য অধিকার আইনের বাস্তব প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই দেখার অপেক্ষা।
দৈনিক পুনরুত্থান / মনোহরদী (নরসিংদী)
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: