• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

পুলিশ কর্মকর্তা ও তাঁর স্ত্রী হত্যার দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ঐশি, এখন কারাগারের লাইব্রেরিয়ান


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১:৫৯ পিএম;
পুলিশ কর্মকর্তা ও তাঁর স্ত্রী হত্যার দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ঐশি, এখন কারাগারের লাইব্রেরিয়ান

রাজধানী ঢাকার চামেলীবাগে ২০১৩ সালের আগষ্ট মাসে একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তার ও তাঁর স্ত্রীকে নির্মম ভাবে হত্যা করে তাঁদের ঔরষজাত কন্যা ঐশি। 

চার দেয়ালের মধ্যেই দিন কাটছে পুলিশ কর্মকর্তার মেয়ে ঐশী রহমানের। পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের স্বপ্ন ছিল ঐশী বড় হয়ে চিকিৎসক হবে, মানুষের সেবা করবে। কিন্তু নিজ বাবা ও মাকে হত্যা করে এখন তার জীবন কাটছে অন্ধকার কারাগারে। ঐশী এখন গাজীপুরের কাশিমপুরের মহিলা কারাগারের লাইব্রেরিয়ানের দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

কারা সূত্র জানায়, ঐশীর বয়স যখন ১৯ বছর, তখন তার কারাজীবন শুরু হয়। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৫৭ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন হচ্ছে ৩০ বছর। সে হিসাবে তার ১৩ বছর কারাবন্দিত্ব জীবন পার হয়েছে। আরো ১৭ বছর তাকে কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে কাটাতে হবে। তখন তার বয়স হবে ৪৯ বছর

সূত্র জানায়, কোনো যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত বন্দি যদি কারাগারে শৃঙ্খলা মেনে বন্দিত্ব কাটাতে পারেন, তাহলে সরকার তাকে বন্দিজীবনের কিছুটা মওকুফ করতে পারে।

ঢাকার চ্যামেলীবাগে ২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন নিহত মাহফুজুর রহমানের ভাই মশিউর রহমান বাদী হয়ে পল্টন থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই দিনই নিহত দম্পতির মেয়ে ঐশী রহমান পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করে পুলিশকে জানান, তিনি নিজেই বাবা-মাকে খুনে করেছেন। ওই কথা শুনে আঁতকে ওঠে পুলিশ। ২০২৩ সালের ২৪ আগস্ট ঐশী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তবে পরে তিনি ওই জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেন। ২০১৫ সালের ৯ মার্চ ঐশী ও তার দুই বন্ধুর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র এবং নিহতদের বাসার শিশু গৃহকর্মী সুমীর বিরুদ্ধে শিশু আইনে পৃথক অভিযোগপত্র দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পরে ওই বছরের ৬ মে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রথমে ঐশীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে।

জানা গেছে, পরে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ট্রাইব্যুনাল ৩০ নভেম্বর আবার অভিযোগ গঠন করে। এছাড়া ওই ঘটনার মামলায় ২০১৪ সালের ৯ মার্চ ঐশী রহমান, তার বন্ধু জনি, রনি ও ১১ বছরের কাজের মেয়ে সুমির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ঐশী একাই তার বাবা-মাকে হত্যা করেছে। তার বন্ধু জনি ও রনির বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে ইন্ধন দেওয়া ও পরে তাকে আশ্রয় দেওয়ায় অভিযোগ আনে পুলিশ। লাশ লুকানোর অভিযোগ ছিল শিশু সুমীর বিরুদ্ধে। আদালতে শুনানির পর ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বাবা-মাকে হত্যার মামলায় ঐশীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল নিম্ন আদালত। তার বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অপর বন্ধু জনিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। নিম্ন আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন ঐশী। হাইকোর্ট ২০১৭ সালের ৫ জুন মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। সূত্র জানায়, এরপর থেকেই ঐশীর জীবন কাটছে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে।

এ বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের এআইজি (উন্নয়ন ও মিডিয়া) জান্নাত-উল-ফরহাদ আমার দেশকে জানান, ‘ঐশী এখন লাইব্রেরিয়ান। মহিলা ওয়ার্ডেই থাকেন।

২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বাবা-মাকে হত্যার মামলায় ঐশীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল নিম্ন আদালত। হাইকোর্টের রায়ের আগ পর্যন্ত প্রায় এক বছর ছয় মাস কনডেম সেলে ছিলেন ঐশী। যাবজ্জীবন সাজা হওয়ার পর তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে মহিলা বন্দিদের সঙ্গে রাখা হয়।

ফাঁসির সাজা কমে যাওয়ায় গাজীপুরের কাশিপুর মহিলা কারাগারের ৭ নম্বর মহিলা ওয়ার্ডে থাকছেন ঐশী। ওয়ার্ডের কিছু দূরেই কারাগারের লাইব্রেরি। লাইব্রেরির বই নিবন্ধকের দায়িত্ব পালন করেন ঐশী। ঐশী ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে। কারা কর্মকর্তারা জানান, ঐশী ইংলিশ ভাষার গল্প ও উপন্যাস পড়ে সময় কাটান। তার আচার-ব্যবহার ভালো। তবে তিনি কথা কম বলেন। এছাড়া ঐশীর শ্বাসকষ্টজনিত রোগ আছে।

সূত্র জানায়, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত লাইব্রেরিতে দায়িত্ব পালন করেন ঐশী। মধ্যে তিন ঘণ্টা গোসল ও খাবারের বিশ্রাম দেওয়া হয়। পরে আবার বিকাল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তিনি লাইব্রেরিয়ানের কাজ করেন। কারাগারে থাকা বন্দিরা সেখানে গিয়ে বই পড়েন।

কারা সূত্র জানায়, ফুলের বাগান করতে পছন্দ করেন ঐশী। কারাগারে একাধিক ফুলের বাগানে গিয়ে মাঝে মাঝে পরিচর্যা করেন। তবে সেটি তার জন্য বাধ্যবাধকতা নয়। দিন যত যাচ্ছে, তিনি মুক্তির প্রহর গুনছেন বলে একাধিক কারারক্ষী জানিয়েছেন। তবে তার মুক্তি প্রক্রিয়া আরো দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।

কারা সূত্র জানায়, ঐশী দীর্ঘদিন ধরে কাশিমপুর কারাগারে আছেন। লাইব্রেরির দায়িত্ব দেওয়ার পর তাকে অন্য কোনো কারাগারে পাঠায়নি কারা কর্তৃপক্ষ। মাঝে মাঝে নানা ও নানির স্বজনরা এসে ঐশীকে দেখে যান। ঐশীর দাদা ও দাদির পক্ষের কেউ তাকে দেখতে আসেন না বলে জানা গেছে।

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের নথিতে বলা হয়েছে, ঐশীর বিরুদ্ধে উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তার ফাঁসিই উপযুক্ত। কিন্তু বিশেষ কিছু বিষয় বিবেচনা করে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়। যে পাঁচটি বিষয় বিবেচনা করে তার সাজা কমানো হয়েছে তা হলোÑআসামি এ খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া এবং মানসিকভাবে বিচ্যুতির কারণে। ওই সময় সে অ্যাজমাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারিবারিকভাবে তার দাদি ও মামা অনেক আগে থেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। অর্থাৎ মানসিক বিপর্যয়ের ইতিহাস তার পরিবারে আগে থেকেই ছিল।

রায়ে আরো বলা হয়, ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ১৯ বছর এবং তিনি এ ঘটনার সময় সাবালকত্ব পাওয়ার মুহূর্তে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অতীতে ফৌজদারি অপরাধের নজির নেই। ঘটনার দুদিন পর স্বেচ্ছায় থানায় আত্মসমর্পণ করেন। এ কারণে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তার সাজা কমানো হয়। রায়ে আদালত বলে, ঐশীর বাবা পুলিশ বাহিনীতে এবং মা ডেসটিনিতে চাকরিরত ছিলেন। জীবন-জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ঐশীকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি। রায়ে বলা হয়, সন্তানদের জন্য বাবা-মা ও অভিভাবকই হলেন প্রাথমিক শিক্ষক। এ হিসেবে তাদের জন্য ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করা ও সন্তানকে সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিল।

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন