• ঢাকা
  • শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২

Advertise your products here

  1. জাতীয়

সংকটের শঙ্কায় পাম্পে প্রচণ্ড ভিড়


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: শনিবার, ০৭ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৫:০১ এএম;
সংকটের শঙ্কায় পাম্পে প্রচণ্ড ভিড়

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পেট্রলপাম্পে গতকাল শুক্রবার জ্বালানি তেল কিনতে ক্রেতাদের অস্বাভাবিক ভিড় দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য জ্বালানিসংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় অনেকে আগেভাগে  বেশি করে তেল নিয়েছেন। অতিরিক্ত চাহিদার কারণে কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে তেল বিক্রি বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটে।

তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের আমদানি কার্যক্রম নিয়মিত চলছে এবং পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।

তাই গুজবে কান না দিয়ে অযথা জ্বালানি মজুদ না করতে জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছে সংস্থাটি।

 

গতকাল রাজধানীর গাবতলী, দারুস সালাম রোড, মিরপুর,  তেজগাঁও, আসাদগেটসহ বিভিন্ন এলাকার পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ক্রেতার চাপে কোথাও কোথাও বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটে।

সংকটের শঙ্কায় পাম্পে প্রচণ্ড ভিড়রাজধানীর মিরপুর স্যাম অ্যাসোসিয়েট লিমিটেড নামের  ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা রাইড শেয়ারিং চালক আব্দুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার রুটিরুজি পুরোটাই বাইকের ওপর।

শুনছি তেলসংকট দেখা দিতে পারে। আগে দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার অকটেন নিতাম। কিন্তু এখন পুরো ট্যাংক ভরে নিচ্ছি।’

 

এই ফিলিং স্টেশনের বিক্রয়কর্মী মো. মুজাহিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন কয়েক গুণ ভিড় বেড়ে গেছে।

আগে যে চালক ২০০ টাকার তেল কিনত, সে এখন ফুল ট্যাংকি ভরে নিচ্ছে। বাড়তি চাহিদার কারণে তেলের মজুদ দ্রুত কমে যাচ্ছে।’

রাজধানীর টেকনিক্যাল এলাকার আল মাহমুদ ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী মো. জালাল কালের কণ্ঠকে বলেন,  ‘গাড়ির চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চার-পাঁচ গুণ বেশি ছিল। মজুদ তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় আজ (শুক্রবার) সকাল ১০ থেকে ১১টার মধ্যেই বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়।’

গতকাল পরীবাগের পেট্রলপাম্প পরিদর্শন শেষে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘যে সংশয়টি জনগণের তৈরি হয়েছে, আমরা সেটাকে অস্বাভাবিকভাবে দেখছি না।

কারণ একটি যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। ফলে একটা দুশ্চিন্তা বিরাজ করছে। কিন্তু আমি আশ্বস্ত করতে চাই, জ্বালানি তেল নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমাদের কাছে যথেষ্ট মজুদ রয়েছে।’

 

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘গত কয়েক দিনে আমরা কয়েক গুণ বেশি তেল সাপ্লাই দিয়েছি। ক্রেতারা স্বীকার করেছেন তাঁরা বেশি করে তেল নিচ্ছেন। এই আতঙ্ক দূর করতে হবে। সবাইকে বলতে চাই, জনগণের দুর্ভোগ কমানোর জন্য সরকার যথেষ্ট সচেষ্ট আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিকভাবে জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়েছে। ফলে এটি একটা চাপ তৈরি করছে। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সমন্বয়ে যেতে হবে। আমরা চেষ্টা করব দাম না বাড়াতে।’

পরিস্থিতির খোঁজ নিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু হঠাৎ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশন পরিদর্শন করেন। এ সময় জ্বালানি তেল নিতে মোটরসাইকেলচালকদের দীর্ঘ লাইন দেখে তিনি বলেন, ‘অস্থির হবেন না। খামাখা সময় নষ্ট করতেছেন।’

জ্বালানিমন্ত্রী পাম্পে তেল নিতে আসা গাড়িচালকদের বুঝিয়ে বলেন, ‘আপনার সংসারে যদি এক মণ চাল থাকে আর যদি সাপ্লাই না থাকে, আপনি কম করে খাবেন না? এটা সবাইকে বলেন। আর দুই হাজার টাকার (প্রাইভেটকারের জন্য) বেশি (তেল) দেবেন না।’

তেল কেনার সীমা নির্ধারণ করল সরকার

গতকাল বিপিসির এক নির্দেশনায় বলা হয়, একটি মোটরসাইকেলে দিনে দুই লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিদেশ থেকে আমদানি কার্যক্রম/সূচি নির্ধারিত রয়েছে। নিয়মিতভাবে চালান দেশে আনা হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের বাফার স্টক (পর্যাপ্ত মজুদ) গড়ে উঠবে।

এ বিষয়ে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘দেশে বর্তমানে জ্বালানির বড় কোনো সংকট নেই। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি করছে এবং সবাইকে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহবান জানানো হয়েছে।’

বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, গত পাঁচ দিনে দেশে প্রায় এক লাখ টনের বেশি ডিজেল বিক্রি হয়েছে। যেখানে গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৫৫ হাজার টন। বর্তমানে দেশে প্রায় এক লাখ ৮১ হাজার টন ডিজেল মজুদ রয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সাময়িকভাবে প্রায় ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে।

গ্যাসসংকট কাটাতে স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে এলএনজি

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে হচ্ছে। চলমান রমজান ও সেচ মৌসুমে গ্যাসের বড় সংকট এড়াতে সরকার স্পট মার্কেট থেকে দুই কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব কিনতে সরকারের প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে, যেখানে এক মাস আগেও একই পরিমাণ এলএনজি কেনা হয়েছিল প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকায়।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক বলেন, ‘সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গানভোর গ্রুপ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮.২৮ ডলার এবং ভিটল এশিয়ার কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩.০৮ ডলারে দুটি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গানভোরের কার্গো ১৫ থেকে ১৬ মার্চ এবং ভিটলের কার্গো ১৮ থেকে ১৯ মার্চ দেশে পৌঁছানোর কথা।’

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গতকাল এলএনজিসহ মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে মাত্র দুই হাজার ৫৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ৮৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে এলএনজির মাধ্যমে। বাকি অংশ দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন করে সরবরাহ করা হয়।

গ্যাস সরবরাহে রেশনিং শুরু

জ্বালানিসংকটের আশঙ্কায় এরই মধ্যে গ্যাস সরবরাহে রেশনিং কার্যক্রম শুরু করেছে পেট্রোবাংলা। পরিস্থিতি সামাল দিতে দৈনিক প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে আগামী সাত দিনে প্রায় এক হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবির) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহে রেশনিং শুরু হওয়ায় আগামী সপ্তাহ থেকে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করে বিদ্যুতের লোড ম্যানেজমেন্ট শুরু হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকেও পরিস্থিতি বিবেচনায় সাশ্রয়ী ব্যবহারের আহবান জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে বাজারে এলপিজি সরবরাহ নিয়েও কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

 

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন