পরিকল্পনায় গলদ, ১০ হাজার কোটি টাকা খরচা, বারবার ডুবছে চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় এক দশক ধরে চলছে বড় বড় প্রকল্প। খাল খনন, খাল সম্প্রসারণ, রেগুলেটর নির্মাণ, সড়ক, বাঁধ—নানা নামে তিন সরকারি সংস্থার চার প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে খরচ হয়ে গেছে ১০ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্য ছিল, বর্ষা এলেই ডুবে যাওয়া শহরকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্ত করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই আবার ডুবে গেছে চট্টগ্রাম নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।
গত মঙ্গলবার দুপুরের পর কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে প্রবর্তক, চকবাজার, আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, জিইসি, বহদ্দারহাট, হালিশহর, নিউমার্কেট, তিন পুলের মাথাসহ অন্তত ২০টি এলাকা পানির নিচে চলে যায়। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরসমান, আবার কোথাও বুকপানি জমে। অনেক এলাকায় পানি নামতে লাগে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা। পরদিন বুধবারও প্রবর্তক, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশসহ কয়েকটি এলাকায় একই দুর্ভোগ দেখা যায়।
প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় ব্যয়, এত বছর ধরে কাজ, এত সভা, এত সিদ্ধান্ত—তারপরও কেন চট্টগ্রাম নগর বারবার ডুবছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার শুরু প্রকল্পের পরিকল্পনাতেই। জলাবদ্ধতার মতো জটিল সংকট সমাধানে যে ধরনের বিস্তৃত মাঠ সমীক্ষা, পানিপ্রবাহ বিশ্লেষণ, জোয়ার-ভাটা বিবেচনা, খাল-নালা-জলাধারের সমন্বিত মূল্যায়ন দরকার ছিল, তা যথাযথভাবে করা হয়নি। নগরের সব খালকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়নি। ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রস্তাবও বাদ পড়েছে। ফলে প্রকল্প যতই এগোক, পুরো নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না।
প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় ব্যয়, এত বছর ধরে কাজ, এত সভা, এত সিদ্ধান্ত—তারপরও কেন চট্টগ্রাম নগর বারবার ডুবছে?
প্রকল্পগুলো নেওয়া হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। শুরু থেকেই প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের নানা আপত্তি ছিল। মাঠ সমীক্ষার ঘাটতি, খাল অন্তর্ভুক্তির সীমাবদ্ধতা ও সমন্বয়ের অভাব নিয়ে সতর্ক করেছিলেন তাঁরা। তবে সেই সময় সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এসব পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যে কারণে এখনো নগরবাসী দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
গত এক দশকে আওয়ামী লীগ আমলে মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সেবা সংস্থার সমন্বয়ে বড় আকারে অন্তত ৫০টি সভা হয়েছে। নেওয়া হয়েছে দুই শতাধিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু সিদ্ধান্তগুলোর বড় অংশই কাগজে সীমাবদ্ধ থেকেছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারও বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে একাধিক সভা করেছে। উপদেষ্টারা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তবু মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব একটা আসেনি। এখন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বিষয়টি জাতীয় সংসদে আলোচনায় উঠেছে।
গত বুধবার চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান পয়েন্ট অব অর্ডারে জলাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন জলাবদ্ধতা; মানুষ কার্যত পানিতে ভাসছে। তাঁর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যা থেকে মানুষকে মুক্ত করতে সরকার কাজ করছে।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে চারটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তিনটি সরকারি সংস্থা। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) দুটি, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্প মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। গত মার্চ পর্যন্ত এসব প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। কিন্তু কোনো প্রকল্পই এখনো শতভাগ শেষ হয়নি।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প সিডিএর ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’। ২০১৭ সালে অনুমোদিত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। কাগজে-কলমে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৯০ শতাংশ। তারপরও নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কেন বারবার বুকসমান পানিতে ডুবছে—এ প্রশ্ন তুলছেন নগরবাসীরা।
গত বুধবার চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান পয়েন্ট অব অর্ডারে জলাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন জলাবদ্ধতা; মানুষ কার্যত পানিতে ভাসছে। তাঁর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যা থেকে মানুষকে মুক্ত করতে সরকার কাজ করছে।
সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্পে ৩৬টি খাল নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি খালগুলোর বেশির ভাগই শেষ পর্যায়ে। তবে হিজড়া খাল ও জামালখান খালের কাজ এখনো চলমান। এসব খালে কাজের জন্য অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টির সময় ওই বাঁধের কারণে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় বলে সিডিএর কর্মকর্তারাই স্বীকার করছেন।
জানতে চাইলে সিডিএর চেয়ারম্যান মো. নুরুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের কিছু সুফল ইতিমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। গত বছর আগের তুলনায় কম এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সব খাল একসঙ্গে নেওয়া সম্ভব হয়নি। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রথম ধাপে ৩৬টি খাল নেওয়া হয়েছে। বাকি খালগুলো পর্যায়ক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর সহায়তা না থাকলে অনেক জায়গায় কাজ এগোনো কঠিন হতো। তবে প্রকল্প শেষ হলেও শহরের ২০-২৫ শতাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা থেকে যাবে। সে জন্য প্রকল্পের বাইরে থাকা খালগুলো খনন ও সম্প্রসারণ করতে হবে।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: