ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণের দাবি:বাকেরগঞ্জ জেলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় রাজধানীতে মানববন্ধন
ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণের দাবি:বাকেরগঞ্জ জেলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় রাজধানীতে মানববন্ধন, ইতিহাস-প্রশাসনের প্রশ্নে নতুন বিতর্ক
নজরুল ইসলাম আলীম:
দক্ষিণ বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক বাকেরগঞ্জ জেলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব-এর সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন নতুন করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নিয়ে জাতীয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৯টায় আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বক্তারা শুধু একটি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক পরিচয়ের পুনরুদ্ধারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসেন।মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ১৭৪১ সালে মির্যা আগা মুহম্মদ বাকের শ্রীমন্ত নদীর তীরে বাকেরগঞ্জ বন্দরের গোড়াপত্তন করেন, যা পরবর্তীতে দক্ষিণ বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। ১৭৯৭ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল স্যার জন শোর আনুষ্ঠানিকভাবে বাকেরগঞ্জকে জেলা ঘোষণা করেন। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে (১৭৯৭-১৯৯৩) এই অঞ্চল একটি স্বীকৃত জেলা হিসেবে টিকে ছিল—যা ইতিহাসে এর গভীর প্রাতিষ্ঠানিক শিকড়ের সাক্ষ্য বহন করে।বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১৮০১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর প্রশাসনিক সুবিধার্থে জেলা সদর বর্তমান বরিশাল-এ স্থানান্তর করা হলেও “বাকেরগঞ্জ” নামের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অটুট ছিল। ফলে ১৯৯৩ সালে জেলার নাম বিলুপ্ত করে এটিকে উপজেলায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক পরিচয়ের বিচ্ছিন্নতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি এই পরিবর্তন একটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়। তাদের দাবি, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী জাতীয় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটি—বিশেষ করে নিকার (National Implementation Committee for Administrative Reform)-এর অনুমোদন প্রয়োজন হলেও এ ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। এমনকি এ সংক্রান্ত কোনো সুস্পষ্ট প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়ায় বিষয়টি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।এই প্রেক্ষাপটে আয়োজক সংগঠন “বাকেরগঞ্জ জেলা পুনরুদ্ধার কমিটি” এবং সহযোগী সংগঠন “গর্বের বাকেরগঞ্জ” মনে করে, একটি অঞ্চলের প্রশাসনিক পরিচয় কেবল মানচিত্রের বিষয় নয়; এটি তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনগণের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাদের মতে, বাকেরগঞ্জ নামটি বিলুপ্ত হওয়ায় নতুন প্রজন্ম তাদের ঐতিহাসিক শিকড় সম্পর্কে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।তবে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বাস্তবতা, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়—এমন মতও রয়েছে নীতি বিশ্লেষকদের একটি অংশের। তাদের মতে, শুধুমাত্র ঐতিহাসিক আবেগ নয়, বরং একটি জেলার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট প্রশাসনিক যৌক্তিকতা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং টেকসই পরিকল্পনা।সবকিছু মিলিয়ে, বাকেরগঞ্জ জেলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি এখন শুধু একটি স্থানীয় আন্দোলন নয়; এটি ইতিহাস, প্রশাসন ও পরিচয়ের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিতর্কে রূপ নিচ্ছে। সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—এই দাবির পেছনের ঐতিহাসিক সত্যতা, আইনি ভিত্তি এবং বর্তমান প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
- বিষয়:
- ঐতিহ্যের* পুনর্জাগরণের,দাবি
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: