খাল খনন পরিকল্পনা:পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত
নজরুল ইসলাম আলীম:
বাংলাদেশ নদী-খাল-বিলের দেশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অব্যবস্থাপনা, দখল ও ভরাটের কারণে অসংখ্য খাল ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও জলাবদ্ধতা, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট—এই দ্বৈত সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছে দেশের কৃষি ও গ্রামীণ জনপদ। এমন বাস্তবতায় আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যা দেশের পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলা-র সাহাপাড়া এলাকায় খাল খনন প্রকল্প উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী যে পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন, তার মূল লক্ষ্য হলো বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষির জন্য সেচ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে কৃষি এখনও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করতে হবে। সে ক্ষেত্রে পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে না, আবার শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান না। খাল পুনঃখনন করলে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং তা কৃষিকাজে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে, যা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।উদ্বোধন হওয়া সাহাপাড়া খাল প্রকল্পের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ কিলোমিটার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩১ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন এবং প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ এর সুবিধা পাবেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৬০ হাজার টন অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। খালের দুই পাশে রাস্তা নির্মাণ এবং বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনাও রয়েছে, যা স্থানীয় যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।বাংলাদেশের ইতিহাসে কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। কৃষকদের সহায়তা, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ উন্নয়নে তাদের বিভিন্ন উদ্যোগ আজও আলোচিত। বর্তমান সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনাও সেই ধারাবাহিকতার একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।তবে বড় আকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রথমত, খাল খননের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ভরাট হয়ে না যায়। দ্বিতীয়ত, দখল ও দূষণ রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে তারা নিজেরাই খাল রক্ষা ও ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখতে পারেন।বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা দেশের কৃষি উৎপাদন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। একই সঙ্গে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনা একে অপরের পরিপূরক। তাই খাল পুনঃখননের এই উদ্যোগ যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
- বিষয়:
- খাল* খনন,পরিকল্পনা
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: