রামেক হাসপাতালে ১৮ দিনে ৫১ শিশুর মৃত্যু
রামেক হাসপাতালে আইসিইউ অব্যবস্থাপনা
১৮ দিনে ৫১ শিশুর মৃত্যু
‘আমার বচ্চা ২১ দিন নিউমোনিয়ায় কষ্ট পাচ্ছিল। ফুসফুস নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ওকে আইসিইউতে ভর্তি করতে বলেছিলেন ডাক্তাররা। দুই দিন অপেক্ষা করে আইসিইউর সিরিয়াল পাইনি।
তাকে নিয়ে ঢাকার হাসপাতালে যাই। এর পরও তাকে বাঁচানো যায়নি। আগেই রাজশাহী হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করানো গেলে আজ এই কঠিন দিনের মুখে পড়তে হতো না আমাকে। একটি আইসিইউ বেডের জন্য আমার সন্তানকে হারাতে হলো।
’ এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে গতকাল শনিবার বিকেলে কথাগুলো বলছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা তমা বেগম। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২১ দিন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল তাঁর ১৫ মাসের সন্তান সাইফান। গত ২২ মার্চ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড থেকে সাইফানকে পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। তখন হাসপাতালের আইসিইউর কোনো শয্যাই খালি ছিল না।
সাইফানের সিরিয়াল ছিল ২২ নম্বরে। গত ২৪ মার্চও সিরিয়াল দিয়ে তার জন্য শয্যা মেলেনি। অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে তার অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। শেষমেশ সাইফানের বাবা শিশির ইসলাম ছেলেকে নিয়ে ওই দিনই বিকেল ৪টায় রাজশাহী থেকে রওনা দিয়ে রাত ৯টায় ঢাকার ডিআরবি হাসপাতালে পৌঁছেন। আইসিইউতে ভর্তি করানো হয় তাকে।
হতাশ মা-বাবার বুকে তখন আশা জমছিল। কিন্তু এখানে ভর্তি করানোর ঘণ্টা দুয়েক পরই মারা যায় তাঁদের আদরের সন্তান।
শুধু কি সাইফান? রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে শয্যা না পেয়ে এভাবে গত ১০ মার্চ থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত ১৮ দিনে মারা গেছে ৫১ শিশু। তারা সবাই আইসিইউ শয্যার জন্য ‘অপেক্ষমাণ তালিকায়’ ছিল। তারা সিরিয়াল পেয়েছে মৃত্যুর পর। তাদের বেশির ভাগই মারা গেছে রাজশাহী হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। তাদের প্রত্যেককে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নেওয়ার জন্য চিকিৎসকরা সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু তাদের কাউকেই হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করাতে পারেননি অভিভাবকরা। হাসপাতাল সূত্র জানায়, গতকাল সকালের পর অপেক্ষমাণ আরো দুটি শিশু মারা গেছে। যদিও এই দুই শিশুর নাম-ঠিকানা দেয়নি দায়িত্বরত সূত্রটি।
গতকাল বিকেলে হাসপাতালের আইসিইউ ও শিশু ওয়ার্ডে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় রোগী ও তাদের স্বজনদের অন্তহীন ভোগান্তির চিত্র। চার বছর বয়সী আদিব হাসান ভর্তি আছে হাসপাতালের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে। ঠাণ্ডাজনিত কারণে শ্বাসকষ্ট এতটাই বেশি যে তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসকদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে গত শুক্রবার দুপুরে আদিবকে সাধারণ শিশু ওয়ার্ড থেকে আইসিইউতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা। এরপর আদিবের বাবা শাহীন আলম তাকে হাসপাতালের নতুন ভবনের পঞ্চম তলায় শিশু আইসিইউতে ভর্তি করানোর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যান। কিন্তু তিনি গিয়ে দেখেন—তার আগে আরো ৩১ শিশু রোগীর সিরিয়াল দেওয়া আছে। শয্যা ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয় আদিবের বাবাকে। গতকাল সকালে আইসিইউতে শয্যা ফাঁকা হলে মোবাইলে কল করে শাহীন আলমকে তাঁর শিশুসন্তানকে ওয়ার্ড থেকে নিয়ে যেতে বলা হয়। তবে শিশু ওয়ার্ডের একজন চিকিৎসক তখন আদিবের অবস্থা কিছুটা ভালো জানিয়ে অক্সিজেনের নলটি খুলে দিয়ে বলেন, ‘এখন আর আইসিইউতে পাঠানো লাগবে না।’ এর ঘণ্টা চারেক পর বিকেলে আবারও আদিবের অবস্থার অবনতি ঘটে। তখন আবারও ওয়ার্ড থেকে তাকে আইসিইউতে নিয়ে যেতে বলা হয়। কিন্তু তখন আদিবের বাবা গিয়ে দেখেন আইসিইউতে শয্যা ফাঁকা নেই। ততক্ষণে অন্য শিশুকে ভর্তি করানো হয়েছে সেখানে। এবার আদিবের সিরিয়াল গিয়ে দাঁড়ায় ৪১ নম্বরে। আদিবের মা হোসনে আরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে আইসিইউর সামনেই বলতে থাকেন, ‘দুপুরেই আমার ছেলেকে যদি আইসিইউতে পাঠানো হতো তাহলে এখন এই অবস্থা হতো না। ছেলে তো আমার নিস্তেজ হয়ে আছে। এখন আর কি বাঁচানো যাবে?’ আইসিইউর দায়িত্বরতদের কাছে অনুরোধ করে তিনি বলতে থাকেন, ‘আপনারা একটু চেষ্টা করে দেখেন না দ্রুত আমার ছেলেকে আইসিইউতে ভর্তি করানো যায় কি না। ছেলের কিছু হলে আমি তো বাঁচব না।’
অন্যদিকে আড়াই বছরের নুসাইবা সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি ছিল। আইসিইউতে রেখে তাকে চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে পাঠানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু নুসাইবাকে আইসিইউতে ভর্তি করাতে গেলে তার বাবা সবুজ আলী দেখতে পান, ২১টি শিশু অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে। নুসাইবার নাম ছিল ২২ নম্বরে। কিন্তু ‘সিরিয়াল’ আসার আগেই গত ১২ মার্চ নুসাইবা মারা যায়। এর চার দিন পর আইসিইউর কর্মীরা ফোন করে শিশুটির সিরিয়াল পাওয়ার কথা জানান। নুসাইবার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়—সে সিরিয়াল পাওয়ার আগেই মারা গেছে। জানা গেছে, নুসাইবার বাড়ি পাবনার চাটমোহর উপজেলার কাঠেংগায়।
মৃত্যুর দুই দিন পর শয্যা : জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত চার মাসের আনাসকে গত ১৩ মার্চ ভর্তি করা হয়েছিল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে। টানা তিন দিন চিকিৎসা শেষেও আনাসের শরীরের অবস্থার উন্নতি না হলে তাকে হাসপাতালের শিশু আইসিইউতে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। আনাসের বাবা শামির উদ্দিন আইসিইউর রিসিপশনে গিয়ে দেখেন—তার আগে ৩৮টি শিশু আছে অপেক্ষমাণ তালিকায়। সিরিয়াল পেতে দুই দিন অপেক্ষা করেন আনাসের বাবা। এর পরও আইসিইউর শয্যা মেলেনি। গত ১৫ মার্চ আনাস মারা গেলে শিশুটির বাবা মরদেহ তাদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে নিয়ে যান। পরে ১৭ মার্চ হাসপাতালের আইসিইউ থেকে ফোন করে বলা হয়, ‘বেড (শয্যা) ফাঁকা হয়েছে, আনাসকে নিয়ে আসেন।’ আনাসের বাবা শামির উদ্দিন গতকাল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার তিন মেয়ের পর একটা ছেলে হয়েছিল। তা-ও বাঁচাতে পারলাম না। বাঁচানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু হাসপাতালের আইসিইউ না পেয়ে শ্বাসকষ্টে আমার বাচ্চাটি মারা গেল। ছেলের আশা আর পূরণ হলো না।’
রাজশাহী নগরের তেরখাদিয়ার সাহিদের শিশুসন্তান নাহিদ গত ১৩ মার্চ এই হাসপাতালে মারা যায়। সাহিদ জানান, আইসিইউতে নেওয়ার জন্য চিকিৎসক পরামর্শ দেওয়ার তিন দিন পর তাঁর ছেলে মারা যায়। এই তিন দিন চেষ্টা করেও ছেলের জন্য আইসিইউতে শয্যা পাননি।
শিশু আইসিইউর সামনে অভিভাবকদের ভিড় : গতকাল বিকেলে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু আইসিইউর সামনে গিয়ে কয়েকজন অভিভাবককে উৎকণ্ঠা ও হতাশা নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। আবার কেউ সিরিয়াল না পেয়ে চোখ মুছতে মুছতে ওয়ার্ডের দিকে চলে যাচ্ছিলেন চিকিৎসাধীন শিশুর কাছে। কুষ্টিয়ার মীরপুর থেকে ১০ মাসের সাফোয়ানকে নিয়ে গতকাল রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসেন তার পরিবারের লোকজন। শ্বাসকষ্ট ও হামে আক্রান্ত সাফোয়ানের অবস্থা বেগতিক দেখে ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা তাকে হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেন। বিকেল ৫টায় সাফোয়ানের বাবা আইসিইউতে গিয়ে দেখেন, তার আগে আরো ৪১ শিশুর নাম আছে অপেক্ষমাণ তালিকায়। সাফোয়ানের বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের এত টাকাও নেই যে ঢাকায় নিয়ে যাব। এখন কী করব?’ একই অবস্থা ৪২ নম্বর সিরিয়ালে থাকা সাত মাসের শিশু মোজাহিদের পরিবারের সদস্যদের। উৎকণ্ঠা নিয়ে শিশু আইসিইউর সামনে অপেক্ষায় ছিলেন শিশুটির বাবা কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার মোস্তাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘গতকাল বাচ্চাকে শ্বাসকষ্টজনিত কারণে নিয়ে এসেছি এখানে। আজকে বিকেলে চিকিৎসকরা ছেলেকে আইসিইউতে নিতে বলেছেন। এসে দেখি ৪২ নম্বর সিরিয়াল পড়েছে। এত শিশুর পরে কিভাবে ভর্তি করাব আমার বাচ্চাকে!’
৭০ শতাংশ শিশুকে বাঁচানো যেত : রামেক হাসপাতালের আইসিইউর একাধিক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, আইসিইউতে ভর্তি করাতে পারলে গত ১৮ দিনে যে অর্ধশত শিশু মারা গেছে, তার মধ্যে কমপক্ষে ৭০ শতাংশকে বাঁচানো যেত। তিনি বলেন, ‘শিশু আইসিইউতে গত ১ থেকে ২৮ মার্চ সকাল পর্যন্ত ১০৪ শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৩১ জন। আমাদের চিকিৎসাসেবার মান ভালো বলেই এখন রোগীর চাপ বেশি। সম্প্রতি গড়ে প্রতিদিন ৩০টির বেশি শিশু অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকছে। কিন্তু আমরা মাত্র ১০টি করে শিশু ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে পারছি। অপেক্ষমাণ শিশুদের অনেকেই সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাচ্ছে আইসিইউ শয্যা না পেয়ে।’
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
- বিষয়:
- রামেক* হাসপাতালে,১৮দিনে৫১
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: