বঙ্গে ফুটল পদ্ম, ‘দিদি’র পতন
- পশ্চিমবঙ্গে মমতা যুগের অবসান
- তামিলনাড়ুতে সুপারস্টার থালাপতি বিজয়ের চমক
- কেরালায় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফের জয়
- আসামে বিজেপির হ্যাটট্রিক
- পুদুচেরিতে আবারও ফিরল বিজেপি জোট
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বসতে চলছে কোনো হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ সময় সোমবার দিবাগত রাত ১টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রাথমিক ফলাফলে পশ্চিমবঙ্গে ভোট হওয়া ২৯৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি নিশ্চিত করেছে ২০৮টি আসন। অন্যদিকে তৃণমূল পেয়েছে ৭৯টি আসন।
পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি গতকাল ভারতের তামিলনাড়ু, কেরালা, আসাম ও পুদুচেরিতেও ভোট গণনা হয়েছে। তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে চমক দেখিয়েছে সুপারস্টার থালাপতি বিজয়ের নতুন দল তামিলাগা ভেত্রি কাঝাগাম (টিভিকে)। প্রাথমিক ফলাফলে ডিএমকে ও এআইএডিএমকের মতো ঐতিহ্যবাহী দলকে পেছনে ফেলে এককভাবে এগিয়ে রয়েছে দলটি। এই প্রতিবেদন লেখার সময় ২৩৪টি আসনের মধ্যে থালাপতি বিজয়ের দল টিভিকে ১০৭ আসন পেয়েছে।
আর ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৪ আসন।
কেরালায় ১৪০টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) ৮৯ আসন পেয়েছে। আর লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) পেয়েছে ৩৫ আসন। বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ পেয়েছে তিনটি আসন।
আসামে ১২৬টি আসনের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ পেয়েছে ১০২টি আসন। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন আইএনসি পেয়েছে ২১টি আসন।
পুদুচেরিতে ৩০টি আসনের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ১৮টি আসন পেয়েছে। কংগ্রেস জোট পেয়েছে ছয়টি আসন।
পশ্চিমবঙ্গে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ফল স্পষ্ট হতেই বিজেপি শিবিরে উল্লাস আর তৃণমূলে বিষাদের চিত্র দেখা গেছে।
পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জায়গা থেকে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি কর্মীদের মধ্যে সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের ‘দুর্গ’ বলে পরিচিত একাধিক অঞ্চল দখল করতে চলেছে বিজেপি বলে অভিযোগ করছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে ব্যারাকপুরে তৃণমূল প্রার্থীর ওপর আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে বিজেপি এজেন্টদের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে রিপোর্ট জমা পড়েছে।
অন্যদিকে কোচবিহার জেলার দিনহাটায় তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে বলে জানিয়েছেন ডিআইজি অঞ্জলি সিং। এ ছাড়া বাঁকুড়াতেও কাউন্টিং সেন্টার চত্বরে তৃণমূল ও বিজেপির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। দুই দলই একে অন্যের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে। তবে এ নিয়ে প্রশাসনের তরফ থেকে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
ধুতি-পাঞ্জাবি পরে উদযাপন মোদির, দিলেন বদলের বার্তা
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এগিয়ে থাকার খবরে রাজধানী দিল্লিতে বিজেপির সদর দপ্তর থেকে মঞ্চে উঠে বদলের বার্তা দিয়েছেন মোদি। তাঁর পরনে ছিল ঘিয়ে রঙের গরদের ধুতি, গায়ে অফহোয়াইট রঙের তসরের পাঞ্জাবি। গলায় পাড়ওয়ালা উত্তরীয়। সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অমিত শাহসহ অন্য নেতারাও। পাশে ছিলেন বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন। এ সময় মোদি বলেন, ‘বাংলায় রাজনৈতিক হিংসায় অনেক জীবন নষ্ট হয়েছে, এবার বদলা নয়, বদল।’
শুধু বাঙালির সাজই নয়, বিজেপির সদর দপ্তরে বাজানো হয় নির্বাচনী গান, ‘পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার’।
এর আগে এক্স হ্যান্ডলে তিনি লিখেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে! ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনগণের শক্তির জয় হয়েছে এবং বিজেপির সুশাসনের রাজনীতি জয়ী হয়েছে। আমি পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রণাম জানাই। জনগণ বিজেপিকে এক অভূতপূর্ব রায় দিয়েছেন এবং আমি তাঁদের আশ্বাস দিচ্ছি, আমাদের দল পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করবে। আমরা এমন একটি সরকার দেব, যা সমাজের সকল স্তরের মানুষের সুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে।’
বিজেপি ১০০টিরও বেশি আসন লুট করেছে, এই জয় অনৈতিক
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ তুলেছেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিজেপি ১০০টিরও বেশি আসন চুরি করেছে। বিজেপি জালিয়াতি করেছে। নির্বাচন কমিশন এখন বিজেপি কমিশনে পরিণত হয়েছে। আমরা বারবার এ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছি। কিন্তু কেউ শোনেনি। বিজেপির এই জয় অনৈতিক। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যোগসাজশে নির্বাচন কমিশন যা করেছে তা পুরোপুরি অনৈতিক। তারা জোরপূর্বক এসআইআর পরিচালনা করেছে। তারা অত্যাচার চালিয়েছে। তারা কাউন্টিং এজেন্টদের গ্রেপ্তার করেছে। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।’
স্থানীয় সময় গতকাল সন্ধ্যায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনাকেন্দ্র থেকে বেরোনোর সময় এ কথা বলেন তিনি। তার পরে গাড়িতে উঠে কালীঘাটের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। গণনাকেন্দ্র থেকে বেরোনোর সময়ও ‘চোর চোর’ স্লোগান দেয় বিজেপি সমর্থকরা। সোমবার দুপুরে গণনাকেন্দ্রে প্রবেশের সময়ও বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা তাঁর উদ্দেশে স্লোগান দিয়েছিল। তখনো তাঁর গাড়ির সামনে ‘চোর চোর’ স্লোগান তোলা হয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে কে হবেন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী তা নিয়ে চলছে তুমুল জল্পনা। বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীসহ রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতারা দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকারের সমাপ্তি ঘটতে চলেছে এবং বিজেপিই সরকার গঠন করবে। এর আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একাধিকবার বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী একজন বাঙালিই হবেন।
সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজনৈতিক মহলে ও ভারতীয় গণমাধ্যমে বেশ কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে রয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, সাবেক রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার এবং সাবেক সাংবাদিক ও রাজ্যসভার সাবেক সদস্য স্বপন দাশগুপ্ত। তবে দলীয়ভাবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে মুছে যাওয়ার মুখে বামপন্থীরা
ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে বামপন্থীরা কার্যত মুছে যাওয়ার মুখে। টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্যে লড়াই করলেও কেরালার ভোটাররা কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) ভোটকেই বেছে নিয়েছে। ১৯৭৭ সালের পর এই প্রথম ভারতের কোনো রাজ্যে বামপন্থীদের কোনো মুখ্যমন্ত্রী থাকছেন না। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার পর কেরালা হাতছাড়া হওয়া ভারতের বাম দলগুলোর জন্য একটি বড় ধাক্কা, যা তাদের জাতীয় রাজনীতির মূলধারা থেকে আরো সরিয়ে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্র : বিবিসি, এনডিটিভি, আনন্দবাজার পত্রিকা
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
- বিষয়:
- বঙ্গে* ফুটল,পদ্ম,
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: