বাজারে বোতল সয়াবিনের কৃত্রিম সংকট তৈরি
ডিলারদের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর কারসাজি
বাজারে বোতল সয়াবিনের কৃত্রিম সংকট তৈরি
ঈদ সামনে রেখে ফের অস্থির হয়ে উঠছে ভোজ্যতেলের বাজার। নতুন সরকারকে চাপে ফেলে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম আরেক দফা বাড়াতে নতুন করে কারসাজি শুরু করেছে পুরোনো-নতুন মিলে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ উঠেছে, রোজা শুরুর পর থেকেই ডিলারদের মাধ্যমে খুচরা বাজারে তেলের সরবরাহ কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়। প্রথম রমজান থেকেই মুদি দোকানে দিনে ২০ কার্টনের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৩ কার্টন। এতে বাজারে তৈরি হয় কৃত্রিম সংকট। উধাও হয়ে যাচ্ছে বোতলজাত সয়াবিন তেল। পরিস্থিতিকে পুঁজি করে রাতারাতি ভোক্তাকে নিঃস্ব করার ছক কষছে কিছু প্রতারক ব্যবসায়ী। দাম বৃদ্ধির জন্য ইরানের যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের অজুহাতও সামনে আনছে তাদের কেউ কেউ। সুযোগ বুঝে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে সর্বোচ্চ ১৪ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে অসৎ ব্যবসায়ীরা। এতে বিপাকে পড়ছেন সব শ্রেণির ক্রেতা।
১০ নভেম্বর সয়াবিন তেল লিটারে ৯ টাকা বাড়ানোর অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। ২৪ নভেম্বর তারা আবারও মূল্য সমন্বয়ের সুপারিশ করে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে দুবার অনুমতি চাওয়া হলেও মন্ত্রণালয় সাড়া দেয়নি। এ পর্যায়ে ব্যবসায়ী সংগঠন সরকারকে পাত্তা না দিয়ে অনুমতি ছাড়াই প্রতি লিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। মোড়কে নতুন দাম উল্লেখ করে বাজারে তেল সরবরাহ করে। তখন ক্রেতাকে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামেই তেল কিনতে হয়েছে। সরকারকে না জানিয়ে নভেম্বরে আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোয় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তখন ব্যবসায়ীদের শোকজও দেওয়া হয়। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের পর লিটারে ৬ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ, সরকারকে পাশ কাটিয়ে নিজেরা লিটারপ্রতি ৯ টাকা বাড়িয়ে বিশাল অঙ্কের অর্থ বাজার থেকে হাতিয়ে নেয় তারা। পরে উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে ৯ টাকা থেকে ৩ টাকা কমিয়ে ৬ টাকা বাড়তি আদায় করার সুযোগ পেয়ে যায়।
রোববার রাজধানীর জিনজিরা কাঁচাবাজারে গিয়ে ৬টি মুদি দোকানের ৬টিতেই বোতল সয়াবিন তেলের সংকট দেখা গেছে। এক ও দুই লিটারের গুটিকয়েক বোতল থাকলেও ৫ লিটারের সয়াবিনের বোতল নেই। তবে এখন পর্যন্ত এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিনরে দাম বাড়েনি। প্রতি লিটার বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত ১৯৫ টাকায়। ক্রেতারা যে দোকানে তেল পাচ্ছেন কিনে নিচ্ছেন। আর না পেলে খোলা সয়াবিনের দিকে ঝুঁকছেন। আর এই সুযোগে সেই খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮০-১৯০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। যা সর্বশেষ সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৭৬ টাকা। সেক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে খোলা সয়াবিন তেল খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১৪ টাকা বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
জিনজিরা বাজারের মুদি ব্যবসায়ী মো. সাক্কুর আলম যুগান্তরকে বলেন, রোজা শুরু থেকেই কোম্পানিগুলো তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ২০ কার্টন চাহিদা দিলে ২-৩ কার্টন দিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিগুলো ডিলারদের মাধ্যমে এমন কারসাজি করছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফেলেছে। টার্গেট ঈদের আগেই দাম আরেক দফা বাড়ানো। এমন পরিস্থিতি আর দু-একদিন চলতে থাকলে বাজার থেকে বোতল তেল পুরোপুরি উধাও হয়ে যাবে। তখন তদারকি সংস্থা খুচরা পর্যায়ে তদারকির অভিনয় করবে। তেল না পেয়ে আমাদের জরিমানা করবে। কিন্তু যারা সব সময় কারসাজি করে তাদের রাখবে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এদিন নয়াবাজারের ৪টি মুদি দোকান ঘুরে তেলের সংকট দেখা গেছে। বিক্রেতারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় রোজার আগ থেকেই তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কোম্পানিগুলো ইচ্ছা করে এমন কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। তাদের টার্গেট ছিল ঈদের ১০ দিন আগে বাজারে বোতল তেল শূন্য করা। তারা সেটাই করছে। কারণ ঈদের আগে নতুন সরকারকে চাপ দিয়ে দাম বাড়ানোর ছক তৈরি করেছে।
বাজারের মুদি বিক্রেতা তুহিন বলেন, ৫ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের গায়ের দাম (এমআরপি) ৯৫৫ টাকা। ডিলারের কাছ থেকে আগে এই তেল ৯৩০ টাকায় কিনতাম, বিক্রি করতাম ৯৪০ টাকায়। ১০ টাকা লাভ থাকত। কিন্তু তিন থেকে চার দিন ধরে ৫ লিটারের বোতল কিনতে হচ্ছে ৯৫০ টাকায়, বিক্রি করতে হচ্ছে ৯৫৫ টাকায়। ডিলার পর্যায় থেকে তারা ১০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে আমাদের খুচরা পর্যায়ে ৫ টাকা লাভ কমেছে।
কাওরান বাজারের তীর ব্র্যান্ডের ডিলার এটিএন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম বলেন, তীরের তেলের বেশ সংকট রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে দুই থেকে আড়াইশ কার্টন তেল পেতাম সেখানে সপ্তাহের শুরুতে মাত্র ৫০ কার্টন তেল পেয়েছি। তাই খুচরায় তেল সরবরাহ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। তবে কোম্পানিগুলো বলছে চার-পাঁচ দিনের মধ্যে সরবরাহ বাড়বে।
টি কে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আথহার তাসলিম জানান, পরিবহণ সংকটে ভোজ্যতেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। পণ্যবাহী ট্রাক চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছে না। সেজন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও ট্রাকের সংকটে বিভিন্ন স্থানে তেল পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছে। তিনি জানান, গরমের সময় সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে পাম অয়েলের। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি পাম অয়েল আমদানি করে বাংলাদেশ। কিন্তু সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া তাদের পাম অয়েল রপ্তানিতে শুল্ক বসিয়েছে। তারা ভোজ্যতেলের চেয়ে ডিজেল উৎপাদনে বেশি মনোযোগী। তাছাড়া মাসখানেক আগে থেকেই বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম প্রায় ১০০ ডলার বেড়েছে। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে আরও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এসব কারণে বাজারে সরবরাহ কিছুটা কম।
জানতে চাইলে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, সার্বিক তদারকির অভাবেই এমন পরিস্থতি সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা সব সময় সুযোগ খোঁজে। তারা রোজার শুরুতেই সরবরাহ কমাতে শুরু করে। কিন্তু এ পর্যায়ে এসে ইরানের যুদ্ধের অজুহাত দিচ্ছে। তবে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল পরিবহণে সংকট হলেও এ কারণে ভোগ্যপণ্যের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে কিছুটা হলেও সময় লাগবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা তার আগেই দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) আব্দুল জলিল বলেন, প্রতিদিনই বাজারে তদারকি করা হচ্ছে। কোন কারণে সয়াবিন তেলের সংকট তৈরি হচ্ছে তার কারণ খুঁজে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঈদের আগে কোনো পণ্য নিয়ে ক্রেতাকে ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। কারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রতিদিন একাধিক টিম বাজারে তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
- বিষয়:
- বাজারে*বোতল,সয়াবিনের
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: