• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

Advertise your products here

  1. জাতীয়

রাষ্ট্রপতির ভাষণ,রাজনীতির সমালোচনা নাকি মেয়াদ পূরণের কৌশল?


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৬:৪৪ পিএম;
রাষ্ট্রপতির ভাষণ,রাজনীতির সমালোচনা নাকি মেয়াদ পূরণের কৌশল?

নজরুল ইসলাম আলীম:

 

বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির ভাষণ সাধারণত একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই বিবেচিত হয়। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন যে মন্তব্য করেছেন, তা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে। কারণ তার বক্তব্যে শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি—বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—উভয়ের শাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির কঠোর সমালোচনা উঠে এসেছে।রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল আওয়ামী লীগকে ঘিরে তার মন্তব্য। তিনি দলটিকে “ফ্যাসিবাদী প্রবণতার” সঙ্গে যুক্ত করে সমালোচনা করেছেন এবং দুর্নীতির বিস্তারের কথাও উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই রাষ্ট্রপতি নিজেই অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে তার মুখ থেকে এই ধরনের সমালোচনা উচ্চারিত হওয়া রাজনৈতিক মহলে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—এটি কি শুধুই রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো কৌশল?
একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি বিরোধী রাজনীতির নেতৃত্বকেও ছাড় দেননি। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর রাজনৈতিক ভূমিকা ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্য করেছেন।এতে বোঝা যায়, রাষ্ট্রপতি হয়তো দেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং বিভাজনের বাস্তবতাকে সামনে আনতে চেয়েছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বিতা দীর্ঘদিনের।স্বাধীনতার পর থেকে এই দুই রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্বই দেশের রাজনৈতিক গতিপথ অনেকাংশে নির্ধারণ করেছে। ক্ষমতায় থাকলে এক পক্ষ অপর পক্ষকে দুর্নীতি, স্বৈরাচার বা গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। আবার ক্ষমতার বাইরে থাকলে সেই একই দল গণতন্ত্রের সংকট ও রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছে। ফলে রাজনীতিতে পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সংঘাতের সংস্কৃতি ক্রমেই গভীর হয়েছে।রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক ভাষণ যেন সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ওপর একটি প্রতিফলন। তিনি হয়তো ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট কেবল একটি দলের কারণে নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফল, যেখানে ক্ষমতার লড়াই প্রায়ই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ছাপিয়ে যায়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যের পেছনে আরেকটি বাস্তবতাও থাকতে পারে। যেহেতু তিনি অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন, তাই বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেকে নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরার একটি প্রয়োজনীয়তাও তার সামনে রয়েছে। উভয় পক্ষের সমালোচনা করে তিনি হয়তো সেই নিরপেক্ষতার বার্তাই দিতে চেয়েছেন।অন্যদিকে আরেকটি দৃষ্টিকোণও আলোচনায় এসেছে। অনেকের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হয়তো নিজের সাংবিধানিক মেয়াদ পূর্ণ করার একটি রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশল গ্রহণ করেছেন। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতার পালাবদলের সময় অনেক রাষ্ট্রীয় পদই রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়ে। উভয় পক্ষের সমালোচনা করে তিনি হয়তো এমন একটি অবস্থান নিতে চেয়েছেন, যাতে তাকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা না হয়।সবশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার সংস্কৃতির একটি প্রতিফলন। এতে যেমন রাজনৈতিক দলগুলোর অতীত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা উঠে এসেছে, তেমনি ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্যও একটি সতর্কবার্তা রয়েছে।এখন দেখার বিষয়—দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই সমালোচনাকে কতটা আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। কারণ গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নতিতেই নিহিত। আর সেই উন্নতির জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীল রাজনীতি, জবাবদিহিতা এবং জনগণের প্রতি প্রকৃত দায়বদ্ধতা।

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন