• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২

Advertise your products here

  1. জাতীয়

ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে মেরে ফেলবে, বাঁচান


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: শুক্রবার, ০৬ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৫:৫৩ এএম;
ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে মেরে ফেলবে, বাঁচান

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি ভবনের দোতলায় বন্ধ ঘরে গাদাগাদি অবস্থায় অন্তত ২০ জন নারী। কারো কাছে পাসপোর্ট নেই, নেই মোবাইল ফোন। কেড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেসব। দরজার বাইরে তালা।

দিন কাটছে ক্ষুধা আর আতঙ্কে।

সেই ‘বন্দিদের’ একজন নওগাঁর ২২ বছরের এক তরুণী (সংগত কারণে তাঁর নাম প্রকাশ করা হলো না)। অভাবী সংসারে একটু সুখের বাতি জ্বালাতে জিটুজি চুক্তির আলোকে গৃহকর্মী পদে সুদূর সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি মাস দুয়েক আগে। কিন্তু সেখানে গিয়ে পড়েছেন এক অন্ধকার বন্দিশালায়, যাকে বলা হয় ‘ক্যাম্প’।

রিয়াদের একটি বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছিলেন দালালের কাছে। পরিণতিতে ঠাঁই হয়েছে স্থানীয় এজেন্সির ওই ক্যাম্পে।

খবর পেয়ে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আমরা ইমোতে যোগাযোগ করি তরুণীর সঙ্গে।

তখন তাঁকে ক্যাম্প থেকে আরেক কফিলের বাসায় কাজে দেওয়া হয়। সেখান থেকেই কথা বলেন তিনি। একে একে শোনা গেল ক্যাম্পবন্দি মেয়েদের দুঃসহ জীবনের কথা। এই প্রবাসিনীর ভাষ্য মতে, দোতলা একটি বাড়ি। নিচতলায় থাকেন এক ফিলিপিন্স নারী, নাম রুহানা।

দোতলায় তিনটি রুম। প্রতিটিতে গাদাগাদি করে ২০ থেকে ৩০ জন পর্যন্ত রাখা হয়। জরুরি জিনিসপত্র কেড়ে নিয়ে ঘরের বাইরে তালা লাগিয়ে দেয় দালালের লোকজন। খাবারের কষ্টও সীমাহীন। সকাল ও রাতের নিয়মিত খাবার এক কাপ চায়ের সঙ্গে একটি রুটি। দুপুরের খাবার হলো পাস্তা। ভাত জোটে তিন থেকে চার দিন পর পর।

 

চিরকুট থেকে সন্ধান : মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশ থেকে যাওয়া নারী গৃহকর্মীদের অবস্থা অনুসন্ধান করছিলাম আমরা। এর মধ্যেই নওগাঁর নির্যাতিতা এই তরুণীর তথ্য আসে আমাদের কাছে। সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার হবিগঞ্জের আরেক তরুণী ২৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টায় দেশে ফিরছেন—এই খবর পেয়ে আমরা ঘণ্টা দুয়েক আগেই অবস্থান নিই ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে থাকে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামে। কিন্তু ওই প্রবাসিনীর বিমান আসে না। সঙ্গে থাকা দালালের কথা আর কাজে কোনো মিল পাই না। এভাবে রাত শেষ হয়ে ভোর হয়ে যায়। দালালদের নানা ছলচাতুরি ও নাটকীয়তার পর অবশেষে ভোর ৬টায় অবতরণ করে জাজিরা এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি (নম্বর জে৯-৫৩৩)। রিয়াদ থেকে কুয়েত হয়ে ঢাকায় আসে এই ফ্লাইট।

বিমানবন্দরের ২ নম্বর বহির্গমন গেট দিয়ে বের হতেই হবিগঞ্জের ওই তরুণীর সঙ্গে সাক্ষাৎ। নিজের ওপর ঘটে যাওয়া অমানবিক নির্যাতনের কথা বলতে বলতে চোখের পানি ছেড়ে দেন তিনি। এক পর্যায়ে ছোট্ট একটি চিরকুট ধরিয়ে দেন আমাদের হাতে। এই চিরকুটটি ছিল নওগাঁর ওই তরুণীর পাঠানো। সেখানে তাঁর মায়ের মোবাইল নম্বর ও সৌদিতে তিনি যে নম্বরে ইমো ব্যবহার করেন, সেটি লিখে দিয়েছেন।

চিরকুটে থাকা মায়ের মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে আমরা ছুটে যাই নওগাঁয়। সদর উপজেলার মধ্যদুর্গাপুর গ্রামের উত্তরপাড়া গ্রামে তাঁদের বাড়ি। সাংবাদিক কাছে পেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন ওই তরুণীর মা। অভাবের সংসারে একটু সুখের জন্য মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়ে এখন চোখের জলে ভাসেন তিনি।

স্থানীয় দালাল রাজ্জাকের প্রলোভনে পড়ে মেয়েকে বিদেশে পাঠাতে রাজি হয়েছিলেন বলে জানান এই মা। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘রাজ্জাক বলেছিল, কোনো টাকা লাগবে না, মেয়ের শুধু পাসপোর্ট করে দিলেই হবে। বাকি সব খরচ কম্পানি দেবে। এতেই আমরা রাজি হয়ে যাই।’ 

মা বলেন, ‘আমার মেয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার দুই দিনের মাথায় এক দিন ইমোতে কল দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। বলে, যে বাসায় কাজে গেছে, ওখানে তাকে নানা ধরনের বাজে প্রস্তাব দিচ্ছে। রাজি না হলেই মারধর করছে। খাবার দিচ্ছে না ঠিকমতো।’ 

এরপর চিরকুটে লেখা ইমো নম্বরের সূত্র ধরে আমরা যোগাযোগ করি নির্যাতনের শিকার ওই প্রবাসিনীর সঙ্গে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টায়। তরুণী বলে চলেন তাঁর সঙ্গে কী কী ঘটছে—‘প্রথম যে বাসায় গৃহকর্মীর কাজে লাগি, সেখানে কফিল আমাকে শুরু থেকেই কুপ্রস্তাব দেওয়া শুরু করে। রাজি না হওয়ায় আমাকে মেরে জখম করে। বিষয়টি দালালকে জানালে কফিল আমাকে নিয়ে বাসার বাইরে অন্য কোথাও রওনা দেয়।’

ক্যাম্প নামের কারাগার : তরুণী বলে চলেন, ‘১৫ মিনিটের মতো গাড়ি চলে। তারপর তাঁরা পৌঁছে যান একটি দোতলা বাড়ির সামনে। তাঁকে তুলে দেওয়া হয় এক ভিনদেশি নারীর হাতে। ওই নারী তাঁকে নিয়ে দোতলায় যান। একটি কক্ষের তালা খুলতেই তিনি দেখেন, ভেতরে অনেক নারী আগে থেকেই জিম্মি। সেখানেই রাখা হয় তাঁকে।’

মেয়েটি আরো বলেন, ‘ওই বাড়িটিকে কেউ বলে অফিস, কেউ বলে ক্যাম্প। এখান থেকেই আমাদের বিভিন্নজনের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই বিষয়টি দেশে থাকা দালালরা আগে থেকেই জানে। শুধু আমরা জানতাম না।’

নামে ক্যাম্প বা অফিস হলেও মেয়েটির বর্ণনা মতে এ যেন এক অন্ধকার কারাগার। রিয়াদ শহরের মধ্যেই একটি দোতলা বাড়ির ওপরতলায় তিন কক্ষের একটি ক্যাম্প রয়েছে, যেখানে প্রতিটি কক্ষে অন্তত ২০ থেকে ৩০ জনকে জিম্মি করে রাখা হয়। কেড়ে নেওয়া হয় মোবাইল ফোন ও পাসপোর্ট। ফলে তাঁরা বাইরের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না।

ওই কামরায় অন্তত ২০ জন ছিলেন তাঁরা। সেখানে বেশির ভাগই বাংলাদেশি নারী। পাশের কামরায় কারা আছে সে বিষয়ে তাঁর কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। তবে কথা শুনে মনে হয়েছে, সেখানেও একাধিক বাংলাদেশি নারীকে জিম্মি রাখা হয়েছে।

এই প্রবাসিনীর ভাষ্য, এখানেই চলে নারী কেনাবেচার প্রক্রিয়া। সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে সৌদি কফিলরা আসেন, দরদাম করে নিয়ে যান পছন্দমতো। তিনি বলেন, ‘আমি এ ধরনের অনৈতিক কাজের বিরোধিতা করতে গিয়ে ক্যাম্পে এসেও মার খাই। রুহানা নামের এক ফিলিপিনো নারী পুরো বিষয়টি দেখভাল করেন। তিনিই আমাদের নানা অনৈতিক কাজে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। রাজি না হলে চলে নির্যাতন। সারা দিন কিছু খেতে দেয় না।’ 

রিয়াদে এজেন্সির একটি অফিস আছে। একবার সেখানে নেওয়া হয়েছিল এই তরুণীকে। তাঁর ভাষ্য মতে, ওই অফিসে দুজন সৌদি নাগরিক, একজন উগান্ডা এবং একজন বাংলাদেশি তরুণকে দেখা গেছে। ওই তরুণ সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন।

তাঁদের নিলামে তোলা হয়—এমন ভয়াবহ অভিযোগও করেন এই তরুণী। তিনি বলেন, ‘গৃহকর্মীর কথা বলে আমাদের আনা হয়েছে। অথচ দেওয়া হয় পতিতালয়ে। এমনও নারী আছেন যাঁরা ওই সব কাজে যাওয়ার পর আর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না।’

প্রবাসিনী এই মেয়েটি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ১৭ জানুয়ারি আমি সৌদি আরব আসি। আমাকে এক কাজের কথা বলে নিয়ে এসে এখানে আসার পর দিচ্ছে অন্য কাজ। এর আগে দুই জায়গায় কাজ দিয়েছিল, কিন্তু বাসার পুরুষ মানুষগুলো আমাকে কুপ্রস্তাব দেওয়ায় আমি সেখান থেকে চলে আসি। সৌদি আরবে সহযোগিতা না পেয়ে আমি বাংলাদেশের যে এজেন্সির মাধ্যমে এখানে এসেছি, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে ফোন ধরে না, ধরলেও গালাগাল করে।’

ভয়াবহ এই নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরার জন্য আকুতি জানাতে থাকেন নওগাঁর এই নারী। এরপর তাঁর সামনে খুলে যেতে থাকে দালালের আসল মুখোশ। দালাল রাজ্জাক তাঁকে সাফ জানিয়ে দেন—দেশে ফিরতে হলে গুনতে হবে দুই লাখ টাকা।

পল্টনে দালালের অফিসে : ঘটনার সরেজমিন অনুসন্ধানে গত ১ মার্চ রবিবার আমরা ছদ্মবেশে যাই রাজধানীর দৈনিক বাংলা মোড়ে দালাল রাজ্জাকের অফিসে। ওই তরুণীর বাবার সঙ্গে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা হাজির হই ‘মাশাআল্লাহ ওভারসিজ’-এর অফিসে। এখানে কাজ করেন রাজ্জাক। এই এজেন্সির মাধ্যমেই জানুয়ারির প্রথম দিকে ওই তরুণীকে পাঠানো হয় সৌদি আরবে। আমরা ছদ্মবেশে তরুণীর ভাই পরিচয়ে অবস্থান নিই। নানা নাটকীয়তার এক পর্যায়ে আমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় দালাল রাজ্জাক হোসেনের। এ সময় আমাদের সঙ্গে তরুণীর ফুফাও ছিলেন।

এর আগেও একাধিকবার তাঁরা অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু কোনো অভিযোগই আমলে নেয়নি এজেন্সি, উল্টো হুমকি-ধমকি দিয়ে তাঁদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বরাবরের মতো নিজের নির্যাতনের শিকার হওয়া মেয়েকে ফেরত আনার কথা বলেন বাবা। আর ঠিক তখনই তাঁর দিকে তেড়ে এসে রাজ্জাক বলেন, ফিরিয়ে আনতে টাকা লাগবে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকলে আমরা জানতে চাই, একজন নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন জেনেও ফিরিয়ে আনতে আপনাদের এত অনীহা কেন?

তখন দালাল রাজ্জাক বলেন, ‘এসব নির্যাতনের কাহিনি সব অভিনয়। তার ওই দেশে ভালো লাগে না তাই চলে আসতে চায়। ৩৫ বছর ধরে এই ব্যবসা করি, এমন অনেক দেখছি।’

এরই মধ্যে ভোল পাল্টে রাজ্জাক বলেন, ওই মেয়ে যে নির্যাতনের শিকার তা আগে তাঁকে জানানো হয়নি। সে জন্য তাঁরা কোনো ব্যবস্থা নেননি।

তাঁকে ফিরিয়ে আনতে আমাদের সামনেই এক লাখ ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন রাজ্জাক। এত টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে মেয়েটির বাবাকে রাজ্জাক বলেন, ‘আপনার মেয়েকে পাঠাতে আমরা অনেক খরচ করেছি। সে কাজ না করে চলে এলে আমাদের নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিতে হবে।’ 

সৌদি আরবে অফিসে নিয়ে মারধরের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে অস্বীকার করেন রাজ্জাক।

এর আগে ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথোপকথনের একাধিক অডিও রেকর্ড কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে। রেকর্ডগুলো পর্যালোচনা করে সত্যতা নিশ্চিত করেছে কালের কণ্ঠ।

ওই রেকর্ডে শোনা যায়, মেয়েটি নির্যাতিত হওয়ার বর্ণনা দেওয়া সত্ত্বেও তা আমলে না নিয়ে উল্টো তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হচ্ছেন রাজ্জাক হোসেন। সেখানেও তাঁর কাছে টাকা দাবি করছেন ফিরিয়ে আনতে।

তরুণীর বাবার সঙ্গে কথোপকথনের ফাঁকে রাজ্জাক বলেন, ‘সৌদি আরবের নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সি এবং তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়। মূলত সৌদির ওই এজেন্সিতেই নারীদের কেনে কফিল বা সে দেশের বাড়ির মালিকরা। কেউ পাঁচ লাখ, কেউ চার লাখ টাকায় কেনে। যদি আমরা কাউকে পাঠাই, সে যদি তিন মাস কাজ করে, তবে সেই টাকার একটা ভাগ পাই আমরা।’

এ সময় চাপের মুখে তরুণীর বাবাকে তাঁর মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন রাজ্জাক হোসেন। তবে পরদিন রাতে আবারও ভোল পাল্টে ফেলেন তিনি। ওই তরুণীর মাকে ফোন করে দ্রুত টাকা পাঠাতে চাপ দেন রাজ্জাক। এমনকি টাকা না পাঠালে তাঁর মেয়েকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলেও হুমকি দেন তিনি, যার একটি অডিও রেকর্ড হাতে এসেছে কালের কণ্ঠের।

তরুণীর শেষ বার্তায় বাঁচানোর আকুতি : গত সোমবার রাত সাড়ে ৯টায় আমাদের কাছে ইমোতে একটি জরুরি ভিডিও বার্তা পাঠান ওই তরুণী। ৩৬ সেকেন্ডের ভিডিওতে খুব দ্রুতগতিতে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম। আমারে এখান থেকে অফিসে নিয়ে যাইতেছে। হয়তো বাংলাদেশ অফিস থেকে বলছে। এখন আমারে ওরা নিয়ে গিয়া কী করবে না করবে আমি কিচ্ছু জানি না। হয়তো আমারে মারধরও করতে পারে। কী করবে আসলে আমার কোনো আইডিয়াই নাই। হয়তো বাংলাদেশ অফিস থেকে ফোন দিয়া বলছে। এ জন্য হয়তো আমারে অফিসে নিয়ে যাইতেছে। আপনারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কিছু একটা করেন। আমারে এখান থেকে বাঁচান। না হলে ওরা আমারে মাইরা ফেলবে। প্লিজ আমারে হেল্প করেন। আমারে সাহায্য করেন আপনারা। আমারে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে নেওয়ার একটা ব্যবস্থা করেন। আপনাদের কাছে আমার এতটুকুই রিকোয়েস্ট।’

এই ভিডিওটি রেকর্ড করার সময় বারবার ডানে-বাঁয়ে তাকাচ্ছিলেন তিনি। ধারণা করা যায়, আশপাশেই কেউ ছিল হয়তো বা।

উদ্ধার ও ফেরানোর আশ্বাস : বিষয়টি নিয়ে জানতে গতকাল বৃহস্পতিবার ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মেয়েটিকে দেশে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়ে জেনেছি। আমাদের রিয়াদের সেফ হোমে মেয়েটিকে দ্রুত নিয়ে আসার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। আমরা তাঁকে নিজস্ব খরচে দেশে ফিরিয়ে আনব।’ 

এর আগে গত সোমবার রাতে কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের প্রধান কাউন্সেলর রেজা-এ-রাব্বীর হোয়াটসঅ্যাপে এই তরুণীর বিষয়ে অবহিত করি। তাঁকে তরুণীর দেশে ফেরার আকুতিমাখা ভিডিও বার্তা এবং যাবতীয় নথিপত্র পাঠাই। তিনি এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে গতকাল পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে কিছু জানাননি।

যে মেয়েটাকে কিনবে, তার তো খরচ হয় : গত রাতে কাজী রিচ ওভারসিজের মালিক কাজী আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নির্যাতন ও হয়রানির বিষয়টি অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, এ রকম অনেক মেয়েই কাজে গিয়ে চলে আসতে চায়। মারধরের বিষয়টি বানোয়াট। মূলত থাকতে চায় না, এটাই বিষয়।

এ সময় আবুল কালাম আরো বলেন, ‘একটা মেয়ে যাইতে একটা অফিসের খরচ আছে। একটা কম্পানি, যে মেয়েটাকে কিনবে, ভিসার টাকা, টিকিটের টাকা, অন্যান্য খাতে তো খরচ হয়। তো এই খরচটা করায় কেন? দুইটা বছর তো কাজ করবে।’

কাজী আবুল কালাম আজাদ আরো স্পষ্ট করে বলেন, ‘ধরেন আপনার বাসায় একটা মেয়ে আনবেন, ভাড়াটারা দিয়ে আনেন কেন, আপনার ফ্যামিলির হেল্পের জন্য। ওরা তো ওদের কালচার আছে বিধায় এই টাকা দিয়ে, ভিসার টাকা দিয়ে নেয়। আর আমাদের অফিস লাইসেন্সের মাধ্যমে আমরা জিনিসটা সম্পন্ন করি। আমরা অর্থাৎ লাইসেন্সও কিছু টাকা পায়।’

ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস প্রতিমন্ত্রীর : প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ বিষয়টি আমি এখনো অবগত নই। যদি কোনো লিখিত অভিযোগ দেয়, তাহলে আমি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। এখানে বেশ কিছু সমস্যা আছে। যেমন—বিভিন্ন এজেন্সি ও দালালের মাধ্যমে প্রতারিত হওয়ার ঘটনাগুলো শোনা যায়। এ ক্ষেত্রে আমাদের বিএমইটিতে নিবন্ধিতদের বিষয়ে আমরা সহায়তা করতে পারি। অনিবন্ধিতদের বিষয়ে আইনগত বা বিধিসম্মতভাবে অনেক সময় কিছু করার থাকে না।’

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন