• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৮ আগষ্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

বিশেষ অনুসন্ধান: মনোহরদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ‘নীলা-রাশেদ’ দম্পতির নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ আগষ্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৩:৪৬ পিএম;
বিশেষ অনুসন্ধান: মনোহরদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ‘নীলা-রাশেদ’ দম্পতির নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ডা. মো. রাশেদুল হাসান মাহমুদের দীর্ঘ প্রায় সাত বছরের কর্মকাল ও প্রায় ১৩ বছরের উপস্থিতিকে ঘিরে নানা অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার এবং একটি কথিত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ সামনে এসেছে। এর আগে তার দীর্ঘ কর্মকাল ও বদলি নীতিমালার ব্যত্যয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এবার হাসপাতালের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উঠেছে আরও গুরুতর কিছু অভিযোগ।

স্থানীয় বাসিন্দা ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক হাসপাতালকর্মীর দাবি, মনোহরদী উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ বর্তমানে ডা. রাশেদ ও তার স্ত্রীকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের প্রভাবাধীন। তাদের অভিযোগ, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা থেকে শুরু করে প্রাইভেট প্র্যাকটিস, অস্ত্রোপচার, রোগী ব্যবস্থাপনা, খাবারের ঠিকাদারি এবং আউটসোর্সিং—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই রয়েছে এই চক্রের নিয়ন্ত্রণ।

বাইরে চেম্বার করতে ‘অনুমতি’, স্ত্রীর বিরুদ্ধে একচেটিয়া অস্ত্রোপচারের অভিযোগ

হাসপাতালে কর্মরত একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রাশেদের অনুমতি ছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসকদের বাইরে ব্যক্তিগত চেম্বার বা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রসূতি রোগীদের সিজারিয়ান অপারেশন নিয়েও উঠেছে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ডা. রাশেদের স্ত্রী ‘নীলা’ ছাড়া অন্য কোনো সার্জন বা চিকিৎসককে এসব অস্ত্রোপচারের সুযোগ দেওয়া হয় না।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরকারি হাসপাতালেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও এমন নিয়ন্ত্রণের কারণে অনেক রোগী কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এনআরএস ক্লিনিক ঘিরে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ

সরকারি দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সরকারি সেবাব্যবস্থার সম্পৃক্ততা থাকলে তা স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। মনোহরদীতে এ নিয়েই উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাছাকাছি ‘এনআরএস (NRS) প্রাইভেট হাসপাতাল’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, ‘NRS’ নামটি নীলা, রাশেদ ও তাদের আরেক অংশীদার শিমুলের নামের আদ্যক্ষর থেকে নেওয়া।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের বিভিন্ন অজুহাতে কিংবা হাসপাতালের নির্দিষ্ট ল্যাব সুবিধা অকার্যকর রেখে ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। এতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার পাশাপাশি রোগীদের আর্থিক চাপও বাড়ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা, পরিচালনা কাঠামো এবং সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে এর সরাসরি ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য আরও যাচাই করা প্রয়োজন।

সরকারি খাবারের ঠিকাদারি ও আউটসোর্সিং নিয়ে প্রশ্ন

হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য সরকারি বরাদ্দে সরবরাহ করা খাবারের ঠিকাদারি নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, লাইসেন্সধারী মূল ঠিকাদারকে প্রভাবিত করে খাবার সরবরাহ ও সংশ্লিষ্ট বাজেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে।

একই সঙ্গে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে হাসপাতালের জনবল নিয়োগ এবং তাদের বেতন-ভাতা উত্তোলনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রক্রিয়ায় বড় অঙ্কের অর্থের অপব্যবহার বা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ল্যাব অচল, বিদ্যুৎ গেলেই অন্ধকার—সেবার মান নিয়ে ক্ষোভ

দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকার পরও হাসপাতালের অবকাঠামো ও সেবার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হয়নি—এমন অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলেই হাসপাতালের বিভিন্ন অংশ অন্ধকারে ডুবে যায়। পর্যাপ্ত বিকল্প আলোর ব্যবস্থা কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী জেনারেটর ব্যবহারের ব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

এ ছাড়া রক্ত পরীক্ষার মতো মৌলিক কিছু প্যাথলজিক্যাল সেবা নিয়মিতভাবে না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা। তাদের দাবি, সরকারি হাসপাতালের ল্যাবসেবা সীমিত বা অকার্যকর থাকায় রোগীদের বাইরে, বিশেষ করে নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে যেতে হচ্ছে।

সরকারিভাবে বরাদ্দ করা ওষুধও অনেক সময় সাধারণ রোগীরা পাচ্ছেন না—এমন অভিযোগও রয়েছে। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে তাদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।

বদলি ঠেকাতে লাখ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ

ডা. রাশেদ ও তার স্ত্রীর দীর্ঘদিন একই এলাকায় অবস্থানের পেছনে প্রভাব ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী ও স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, বিভিন্ন সময়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট মহলে ১৫ থেকে ১৭ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বদলি ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নতুন সরকারের সময়েও একই ধরনের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার আলোচনা স্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে বলে তাদের দাবি।

তবে অর্থ লেনদেনের এই অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে আসেনি। ফলে অভিযোগটি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ জানাল ‘দৈনিক পুনরুত্থান’

মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কথিত প্রশাসনিক অচলাবস্থা, অর্থনৈতিক অনিয়ম এবং চিকিৎসাসেবা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে ‘দৈনিক পুনরুত্থান’-এর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন-সংশ্লিষ্ট তথ্য ও নথিপত্রের ভিত্তিতে ই-মেইলের মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টার দপ্তর, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি), বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

এখন প্রশ্ন—মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়?

সচেতন নাগরিকদের দাবি, সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত রাখতে দ্রুত নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং রোগীদের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

দৈনিক পুনরুত্থান / নিজস্ব প্রতিবেদক, মনোহরদী (নরসিংদী):

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন