প্রকৃতির টানে ছুটছেন দর্শনার্থীরা, উজিরপুরে লাল শাপলার মেলা
শরতের নীল আকাশ, মিঠে রোদ আর দিগন্তজোড়া জলরাশির বুকে ফুটে থাকা হাজারো লাল শাপলা। মনে হয়, সবুজের ক্যানভাসে প্রকৃতি নিজ হাতে এঁকেছে লাল রঙের ছবি।
ভোরের আলোয় সাতলার বিল যেন হয়ে ওঠে কবিতার ‘জলের বুকে লাল শাপলা, চারপাশে সবুজের মেলা।’ এমন নৈসর্গিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন দূর-দূরান্তের প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা।
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জলাভূমি এখন লাল শাপলার অপরূপ সৌন্দর্যে সেজেছে। সাতলা, উত্তর সাতলা, পূর্ব সাতলা, মুড়িবাড়ি, পটিবাড়ি ও আলামদি গ্রামের বিলজুড়ে চোখে পড়ছে লাল শাপলার সমারোহ। ভোরের সূর্যের আলো পানিতে পড়তেই ফুটে ওঠে শাপলার সৌন্দর্য। দূর থেকে মনে হয়, নীলাভ জলরাশির ওপর কেউ যেন বিছিয়ে দিয়েছে লাল গালিচা।
সড়কপথে বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরের সাতলার এই বিল বর্ষা ও শরৎ মৌসুমে হয়ে ওঠে প্রকৃতির এক অনন্য আয়োজন। ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে বিলের বুক চিরে এগিয়ে চলার সময় দুই পাশে শাপলার সারি দেখে মুগ্ধ হন দর্শনার্থীরা। নৌকার বৈঠার ছলাৎছল শব্দের সঙ্গে শাপলার দোল খাওয়া দৃশ্য যেন প্রকৃতির নিজস্ব সংগীত।
‘মনে হচ্ছে রূপকথার রাজ্যে চলে এসেছি’
খুলনা থেকে পরিবার নিয়ে সাতলার শাপলার বিল দেখতে আসা পর্যটক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ছবিতে সাতলার শাপলার বিল দেখেছি। কিন্তু সামনে থেকে এর সৌন্দর্য যে এতটা অসাধারণ, তা এখানে না এলে বুঝতাম না। চারদিকে শুধু শাপলা আর শাপলা। মনে হচ্ছে রূপকথার কোনো রাজ্যে চলে এসেছি।’
বরিশাল থেকে আসা দর্শনার্থী সান্তা ইসলাম বলেন, ‘সকালে নৌকায় করে বিলের মধ্যে ঘুরেছি। পানির ওপর লাল শাপলা, চারদিকে সবুজ আর মাথার ওপর নীল আকাশ—সব মিলিয়ে অসাধারণ লাগছে। এমন পরিবেশে এলে শহরের ব্যস্ততা ও ক্লান্তি মুহূর্তেই ভুলে যাওয়া যায়।’
আরেক দর্শনার্থী রবি হাসান বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাতলার শাপলার অনেক ছবি দেখেছি। তাই বন্ধুদের নিয়ে দেখতে এসেছি। বাস্তবে সৌন্দর্য আরও বেশি। পর্যটকদের জন্য ভালো ঘাট, বসার জায়গা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হলে এখানে আরও বেশি মানুষ আসবেন।’
শাপলার মৌসুমে জমে ওঠে নৌকাভ্রমণ
স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিলে শাপলা ফুটলেও আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এর সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত শাপলা থাকে সতেজ ও প্রস্ফুটিত। তাই সূর্য ওঠার আগেই অনেক দর্শনার্থী বিলের পাড়ে এসে ভিড় করেন।
স্থানীয় নৌকার মাঝি কাদের মোল্লা বলেন, ‘শাপলা ফুটলে আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। নৌকায় করে তাদের বিল ঘুরিয়ে দেখাই। এই কয়েক মাস আমাদের বাড়তি আয় হয়।’
শুধু সৌন্দর্য নয়, জীবিকারও উৎস
সাতলার বিলের শাপলা স্থানীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। অনেকেই বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করেন। জাতীয় ফুল শাপলা শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি স্থানীয় মানুষের খাদ্য ও আয়েরও একটি উৎস।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, বহু বছর ধরে সাতলার জলাভূমিতে লাল, নীল ও সাদা শাপলা ফুটে আসছে। তবে লাল শাপলার আধিক্যই সবচেয়ে বেশি। প্রতিবছর শাপলা ফোটার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা এখানে ছুটে আসেন।
পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ সাতলার শাপলার বিলকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। দর্শনার্থীদের নৌকায় ওঠানামার জন্য ঘাট, অবকাশযাপনের জন্য বাংলো, রাস্তাঘাট সংস্কার ও শৌচাগার নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী সুজা বলেন, ‘সাতলার লাল শাপলার বিল উজিরপুরের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান। এর সৌন্দর্য আমাকে বিমোহিত করেছে। দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে পর্যটনকেন্দ্রটির আরও উন্নয়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
শরতের সকালের আলোয় সাতলার বিল তখনও লাল শাপলায় ভরা। পানির ঢেউয়ে দুলছে শাপলার পাতা, বাতাসে দুলছে ফুল। মনে হয়—‘লাল শাপলার হাসি যেন জলের বুকে লেখা প্রকৃতির প্রেমপত্র।’ সেই প্রেমপত্র পড়তেই প্রতিদিন প্রকৃতির টানে সাতলার বিলে ছুটে আসছেন মানুষ।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: