• ঢাকা
  • সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩২

Advertise your products here

  1. জাতীয়

অর্থপাচার তদন্তের নামে বেসরকারি খাত ধ্বংসের নীলনকশা?


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: সোমবার, ০২ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৫:০৬ এএম;
অর্থপাচার তদন্তের নামে বেসরকারি খাত ধ্বংসের নীলনকশা?

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হলো বেসরকারি খাত। দেশের কর্মসংস্থানের ৯০ শতাংশই বেসরকারি খাতের মাধ্যমে হয়। কিন্তু আমাদের বেসরকারি খাতকে সব সময়ই নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকার তাদের মতো করে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের অনুগত রাখতে চায়।

বাংলাদেশের বেসরকারি খাত আজকের জায়গায় এসেছে সব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেই। একটি লাইসেন্স কিংবা একটি গ্যাস সংযোগ পেতে সরকারের কাছে ধরনা দিতে হয়। সরকারের সহযোগিতা ছাড়া বেসরকারি খাতে ব্যবসা পরিচালনা করা অসম্ভব। এ কারণেই যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা সেই সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে।

এটা করতে হয় শিল্প বাঁচাতে, নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য, লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সুসম্পর্ক রাখতেই হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখনই সরকারের পরিবর্তন হয় তখন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের বিগত সরকারের দোসর বানিয়ে নতুন করে হয়রানি শুরু হয়। 

আবার নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে তাদের পক্ষে ব্যবসায়ীদের টানতে বাধ্য করে। এভাবেই বেসরকারি খাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করা হয়। বেসরকারি খাতকে বিকশিত করার বদলে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার প্রবণতার কারণে যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, তেমনি যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বেসরকারি খাত যথাযথভাবে বিকশিত হয়নি। বেসরকারি খাতের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বন্ধ হলে এই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরো বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হতো।

গণতন্ত্রে তাও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দেনদরবার করে শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা তাঁদের প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন; কিন্তু অনির্বাচিত সরকার যখন ক্ষমতা দখল করে তখন তাদের টার্গেট হয় বেসরকারি খাতকে ধ্বংস করা।

বিশেষ করে বাংলাদেশে দুটি সুশীল নিয়ন্ত্রিত অনির্বাচিত সরকারের যেন অন্যতম কাজই ছিল বেসরকারি খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। এর কারণ হলো এই দুটি সরকারই ছিল বিদেশি এজেন্টদের সমর্থনপুষ্ট এনজিও পরিচালিত সরকার। দেশের বেসরকারি খাত যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে। এতে বৈদেশিক সাহায্যের নির্ভরতা কমবে। এনজিওগুলোর জন্য বিদেশি সাহায্য কমে যাবে। এ কারণেই ২০০৭ সালের এক-এগারো সরকার ক্ষমতায় এসেই বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে বেসরকারি খাতের ওপর নেমে এসেছিল দমন নীতি। এক-এগারো সরকার তথাকথিত সন্দেহভাজন শীর্ষ দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের ইমেজ ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেছিল। কোনো রকম তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই ব্যবসায়ীদের সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজ বলে অভিহিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে শুরু করে এক কুৎসিত মিডিয়া ট্রায়াল। একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই কিভাবে শীর্ষ দুর্নীতিবাজ বলা যায়? এক- এগারো সরকারের আমলে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতই শুধু বহুদূর পিছিয়ে যায়নি, দেশের অর্থনীতিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। এক-এগারো সরকার ভয় দেখিয়ে অস্ত্রের মুখে বিভিন্ন শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আদায় করে, যা ছিল অবৈধ ও অন্যায়। পরবর্তী সময়ে এই অর্থ আদায়ের আইনগত বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। হাইকোর্ট এভাবে ভয় দেখিয়ে জোর করে অর্থ আদায়কে অবৈধ ঘোষণা করেন। ওই টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরও সেই টাকা ফেরত পাননি ভুক্তভোগীরা।

 

ড. ইউনূসের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের অন্তর্বর্তী সরকার ছিল এক-এগারোর সরকারের মতোই বেসরকারি খাতবিরোধী। কারণ এই সরকারও ছিল পুরোপুরি এনজিওনির্ভর। সরকারের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ লোকজন ছিলেন, যাঁরা বিদেশি পাসপোর্টধারী এবং বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট। এই সরকার যদিও একটি গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল, কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড ছিল এক-এগারোর মতোই ষড়যন্ত্রমূলক এবং দেশের স্বার্থবিরোধী। এক-এগারোর সরকার যেমন কোনো ধরনের তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ বানিয়ে মিডিয়া ট্রায়াল করেছিল, ঠিক একই ধারায় ড. ইউনূস কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর চরিত্র হননের নোংরা খেলা শুরু করে। উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ ও তদন্ত ছাড়াই ১১ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অর্থপাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করে।

২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আলাদা চিঠির মাধ্যমে বিএফআইইউকে আইন ও অর্থপাচার প্রতিরোধ বিধিমালার আওতায় কম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে যৌথ তদন্তের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানায়। এরপর ৬ জানুয়ারি যৌথ তদন্তের নেতৃত্ব ও শর্ত চূড়ান্ত করা হয়। এ নিয়ে দুদক, সিআইডি ও কাস্টমস গোয়েন্দাকে দেওয়া বিএফআইইউর চিঠিতে বলা হয়, এসব গ্রুপ ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাৎ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঘুষ, দুর্নীতিসহ অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এসব ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে কর ও শুল্ক ফাঁকি, বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অবৈধ পন্থায় বিদেশে অর্থপাচারের তথ্য রয়েছে। চিঠিতে আরো বলা হয়, অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রমের হালনাগাদ প্রতিবেদন সময় সময় সংস্থাগুলোকে বিদেশে পাচার করা সম্পদ বাংলাদেশে ফেরত আনা ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে আন্ত সংস্থা টাস্কফোর্স ও বিএফআইইউতে সরবরাহ করতে হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কিভাবে সরকার নিশ্চিত হলো, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অর্থ পাচার করেছে? এটা কি তারা স্বপ্নে দেখেছে? নাকি তারা কোনো জাদুমন্ত্রবলে আবিষ্কার করেছে? সরকার কি এই ১১টি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ এবং সঠিক তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছে যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ পাচার করেছে? তা-ই যদি হবে, তাহলে এক বছরের বেশি সময় ধরে কত টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছে সরকার? এক টাকাও না। তাহলে কী উদ্দেশ্যে কেন এই ১১টি প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করা হলো? এর পেছনে রয়েছে সুগভীর ষড়যন্ত্র।

অর্থপাচার নিঃসন্দেহে একটি গর্হিত অপরাধ। যারা দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করে তারা দেশের শত্রু। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, এটা সবাই চায়। কিন্তু আসল অর্থপাচারকারীদের চিহ্নিত না করে, পাচার করা অর্থ উদ্ধারের জন্য কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে এটা দিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির চরিত্র হননের ষড়যন্ত্র ঘৃণিত কাজ। এই ঘৃণিত কাজ করেছে ড. ইউনূসের সরকার; যাদের কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই অর্থ পাচারকারী হিসেবে তকমা লাগিয়ে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। অভিযোগ তদন্তের নামে হয়রানি করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত একটি অভিযোগও প্রমাণ করতে পারেনি। এ থেকেই বোঝা যায়, এই অর্থপাচারের অভিযোগ ছিল বানোয়াট, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এক-এগারোর মতোই বেসরকারি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্যই এই নাটক সাজানো হয়েছিল।

এর পেছনে আরো একটি উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যারা সত্যিকারের অর্থপাচারকারী তাদের আড়াল করতেই এসব নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছিল বলে অনেকে মনে করে।

বাংলাদেশ থেকে কারা অর্থ পাচার করেছে, এটা সবাই জানে। বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ও ব্যবসা রয়েছে। গ্রামীণ আমেরিকা কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো? এ নিয়ে তদন্ত নেই কেন?

সাবেক উপদেষ্টাদের অন্তত সাতজনের বিদেশে বাড়ি আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিতে তাঁরা বৈধ পথে টাকা পাঠিয়েছেন—এমন কোনো তথ্য নেই। তাহলে তো এটা পরিষ্কার যে এই অর্থ তাঁরা পাচার করেছেন।

একটি ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ পেয়েছে দুদক; কিন্তু তাদের নাম নেই অর্থপাচারের তালিকায়। ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পোশাক রপ্তানিকারক শীর্ষ গ্রুপ বিদেশে অর্থ পাচার করেছে, এই অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছিল সিআইডি। কিন্তু অদৃশ্য ইশারায় সেই তদন্ত থমকে আছে।

একটি গ্রুপ সিনেমা নির্মাণের নামে ভারতে অন্তত ৭৩ কোটি টাকা পাচার করেছে। ২০২০ ও ২০২১ সালে এই অর্থ পাচার করা হয়। মানি লন্ডারিং বিষয়ে সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধানে এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এদের নামও নেই এই তালিকায়।

এভাবে খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, অনেক চিহ্নিত অর্থপাচারে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত নেই। তাদের নামও অর্থপাচারকারীদের তালিকায় নেই। তাহলে এই তালিকা কেন? কে করল?

এটা কি তাহলে বেসরকারি খাতের স্বনামধন্য কিছু প্রতিষ্ঠানের ইমেজ নষ্ট করার চেষ্টা? কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার নীলনকশার বাস্তবায়ন?

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন