নতুন গভর্নর কি সত্যিই ঋণখেলাপি?
দেশের ১৪তম গভর্নর হিসেবে ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের পর থেকেই আর্থিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। সামাজিক মাধ্যমে কেউ তাকে ‘ঋণখেলাপি’ আখ্যা দিচ্ছেন, আবার কেউ বলছেন—আইনের চোখে এখন আর সেই তকমা প্রযোজ্য নয়। তাহলে বাস্তবতা কী?
পুরোনো খেলাপি ঋণের ইতিহাস কি এখনও তাকে প্রশ্নের মুখে রাখে, নাকি পুনঃতফসিলের মাধ্যমে বদলে গেছে তার অবস্থান?
মোস্তাকুর রহমান তৈরি পোশাক খাতের একজন উদ্যোক্তা। তিনি বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্য এবং নারায়ণগঞ্জভিত্তিক হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে জানা গেছে, মোস্তাকুর রহমান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডে তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে ৮৯ কোটি ২ লাখ টাকার একটি ঋণ একসময় খেলাপি হয়ে পড়েছিল। গত বছরের এপ্রিলে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধার আওতায় ওই ঋণ খেলাপিমুক্ত হতে পুনঃতফসিলের আবেদন করেন। পরে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট পরিশোধের মাধ্যমে বিশেষ বিবেচনায় ঋণটি ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ পান।
যদিও তিনি দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরের জন্য পুনঃতফসিল চেয়েছিলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা অনুমোদন না করে ১০ বছরের সীমা নির্ধারণ করে।
ব্যাংকিং বিধি অনুযায়ী, নির্ধারিত ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল অনুমোদিত হলে এবং গ্রাহক শর্ত মেনে চললে তাকে আর খেলাপি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয় না। সেই হিসেবে বর্তমানে আইনগতভাবে মোস্তাকুর রহমানকে ঋণখেলাপি বলা যাবে না। তবে এখানেই থেমে নেই বিতর্ক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ও নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান
বিশেষ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে অনেক ঋণগ্রহীতা অতিরিক্ত অর্থ, জরিমানা বা সুদ গুনতে হয়—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সে ক্ষেত্রে নতুন গভর্নর কোনো বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, তিনি ন্যূনতম ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়েই ১০ বছরের পুনঃতফসিল সুবিধা পেয়েছেন।
উল্লেখ্য, দেশে ব্যবসায়িক ক্ষতি ও আর্থিক সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বিশেষ ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালা চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই নীতিমালার আলোকে একাধিক প্রতিষ্ঠান পুনঃতফসিলের সুযোগ পেয়েছে। তবে আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও সমতার প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এদিকে সরকার বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে (মোস্তাকুর রহমান) দেশের ১৪তম গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়। একইসঙ্গে আগের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর–এর অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। নতুন গভর্নরকে অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম–সম্পর্ক ছিন্নের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মোস্তাকুর রহমান পেশায় ব্যবসায়ী ও হিসাববিদ। এর মাধ্যমে দেশে প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো।
মোস্তাকুর রহমান ১৯৬৬ সালে ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই ব্যবসায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি আবাসন খাতেও তার ব্যবসা রয়েছে। বিজিএমইএ, রিহ্যাব, আটাব ও ঢাকা চেম্বারের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন কমিটিতে কাজ করেছেন তিনি। করপোরেট ফিন্যান্স, রপ্তানি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিয়ে তিন দশকের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
সব মিলিয়ে বাস্তবতা হলো—ঋণ একসময় খেলাপি থাকলেও পুনঃতফসিলের শর্ত পূরণ হওয়ায় বর্তমানে আইনগতভাবে তিনি ঋণখেলাপি নন। তবে নীতিগত প্রশ্ন, বিশেষ সুবিধা ও আর্থিক খাতের নৈতিক মানদণ্ড নিয়ে জনমনে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা সহজে থামার নয়। এখন সবার দৃষ্টি—গভর্নরের আসনে বসে তিনি কতটা দৃঢ়ভাবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।
দৈনিক পুনরুত্থান /
- বিষয়:
- নতুন গভর্নর
- ঋণখেলাপি
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: