তোষামোদ নয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়াক গণমাধ্যম”-প্রধানমন্ত্রী
তোষামোদ নয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়াক গণমাধ্যম”-প্রধানমন্ত্রীর বার্তা; স্বাধীন মিডিয়া কমিশনের পথে বাংলাদেশ।।
নজরুল ইসলাম আলীম:
বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতকে নতুন এক নীতিগত মোড়ে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের প্রশংসা বা দলীয় অবস্থানের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চাকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি গণমাধ্যমকে “সত্যকে সত্য হিসেবেই তুলে ধরার” আহ্বান জানিয়েছেন।সোমবার (১৫ জুন) সচিবালয়ে দেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও বার্তা সম্পাদকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এই বক্তব্য দেন। দেশের গণমাধ্যম শিল্প, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠককে সংশ্লিষ্ট মহল বাংলাদেশের মিডিয়া খাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছে।বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়; এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা, সামাজিক সচেতনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, সরকারের প্রশংসা অর্জনের জন্য সংবাদ পরিবেশন নয়, বরং জনগণের কাছে বাস্তবতা তুলে ধরাই সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের গণমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাব, মালিকানাগত স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক চাপের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে।বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ শিবলী সাংবাদিকদের জানান, একটি স্বাধীন ও কার্যকর গণমাধ্যম কমিশন গঠনের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। আগামী ১৮ জুন এ বিষয়ে বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে একটি সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে।তিনি বলেন, “গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পটির টেকসই বিকাশ, পেশাগত মানোন্নয়ন এবং নৈতিক সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োজন। অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সেই কাঠামো তৈরি করা হবে।”পর্যবেক্ষকদের মতে, স্বাধীন কমিশন গঠনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সংবাদমাধ্যমের ওপর প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক চাপ কমানোর ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে কমিশনের গঠনপ্রক্রিয়া, সদস্য নির্বাচন এবং কার্যপরিধি কতটা স্বাধীন হবে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।বৈঠকে উপস্থিত গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা টেলিভিশন শিল্পকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পখাত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা, নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন এবং শ্রমিক অধিকারের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।সাংবাদিক নেতাদের মতে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সম্পাদকীয় নীতির বিষয় নয়; এটি সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। পর্যাপ্ত বেতন, স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং আইনি সুরক্ষা ছাড়া স্বাধীন সাংবাদিকতা বাস্তবায়ন কঠিন।বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। অন্যদিকে সরকারও ভুয়া তথ্য, অপপ্রচার ও দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলে থাকে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যেই স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের উদ্যোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর ‘তোষামোদ নয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর’ আহ্বান নতুন রাজনৈতিক ও নীতিগত তাৎপর্য বহন করছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, বক্তব্যের চেয়ে বাস্তবায়নই হবে মূল পরীক্ষা। যদি স্বাধীন কমিশন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং সংবাদমাধ্যমের নীতিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাত একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারে। অন্যথায় এটি কেবল আরেকটি নীতিগত ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।রাষ্ট্র, গণমাধ্যম এবং জনগণের পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ককে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
- বিষয়:
- তোষামোদ* নয়,সত্যেরপক্ষে
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: