• ঢাকা
  • বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬, ২৩ পৌষ ১৪৩২

Advertise your products here

  1. জাতীয়

অবশেষে সন্তানের কবরের দেখা পেলেন মা, জড়িয়ে করলেন আদর


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: সোমবার, ০৫ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৪:৫২ পিএম
অবশেষে সন্তানের কবরের দেখা পেলেন মা, জড়িয়ে করলেন আদর

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেওয়া ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে নিখোঁজ হন বহু মানুষ। যাদের বেশিরভাগের অজ্ঞাত পরিচয়ে ঠিকানা হয়েছে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে।

আন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ে হারিয়ে যাওয়া স্বজনের খোঁজে ধারে ধারে ঘুরেছেন পরিবারের সদস্যরা। জুলাই যোদ্ধাদের নানা কর্মসূচিতে নিখোঁজ স্বজনের ছবি হাতে দাঁড়িয়েছেন তারা। প্রিয় মানুষটি জীবিত না থাকলেও শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশের জন্য অন্তত কবরটি হলেও দেখার আকুতি জানিয়ে আসছিলেন স্বজনরা। অজ্ঞাত স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে অজ্ঞাত শহীদদের পরিচয় শনাক্তের উদ্যোগ নেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

দীর্ঘ এক মাসের চেষ্টায় রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা অজ্ঞাত শহীদদের মধ্যে ৮ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। সোমবার সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহ ও অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টার উপস্থিতিতে স্বজনদের কবর বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

দীর্ঘ দেড় বছর পর প্রিয় সন্তানের কবরের ওপর কান্নায় ভেঙে পড়েন উত্তরায় নিহত ফয়সাল সরকারের মা হাজেরা বেগম, যাত্রাবাড়ীতে নিহত সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম, মাহিমের মা জোসনা বেগম ও স্ত্রী। এ সময় রায়েরবাজার কবরস্থানে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ।

যাত্রাবাড়ীর কাজলায় আন্দোলনে গিয়ে নিহত সোহেল রানার মা ছেলের কবরের সামনে গিয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। ছেলের নানা স্মৃতি তুলে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, বাবা তুই আমাকে কিছুই বলে গেলি না। আমার পায়ে তেল মালিশ করে ঘুমিয়ে রেখে গেলি। বাবা, আর তোরে পাইলাম না।

মা রাশেদাসহ ৮ শহীদের স্বজনদের আহাজারিতে আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনের কবর পেয়ে কেউ পানি দিচ্ছেন, কেউ মাটি ছুঁছেন, কেউ কবরে লাগানো গাছে হাত বুলাচ্ছেন। সবার চোখের পানিতে ভাসছিল নানা স্মৃতি।

এ সময় পরিবারের অন্য সদস্যরা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

শনাক্ত হওয়া জুলাই যোদ্ধারা হলেন, মাদারটেক এলাকায় নিহত কাবিল হোসেন (৫৮), বাবা : মৃত বুলু মিয়া, মা: ছামেনা বেগম; যাত্রাবাড়ীর মোহাম্মদবাগ এলাকার কাপড় ব্যবসায়ী সোহেল রানা (৩৮), বাবা : মো. লাল মিয়া, মা: রাশেদা বেগম; উত্তরায় নিহত আসাদুল্লাহ (৩১); বাড্ডায় নিহত পারভেজ ব্যাপারী (২৩), বাবা : সবুজ ব্যাপারী, মা: শামসুন্নাহার; যাত্রাবাড়ী এলাকায় নিহত রফিকুল ইসলাম (২৯), বাবা : মৃত খোরশেদ আলম, মা: আলেয়া বেগম; মোহাম্মদপুরে নিহত মাহিম (৩২), বাবা : গাজী মাহমুদ, মা: জোসনা বেগম; উত্তরায় নিহত ফয়সাল সরকার (২৬), বাবা : শফিকুল ইসলাম, মা: হাজেরা বেগম এবং রফিকুল ইসলাম (৫২), বাবা : মৃত আব্দুল জব্বার শিকদার, মা: জাহানারা বেগম।

এদিকে অজ্ঞাত শহীদদের পরিচয় শনাক্তের পর কবর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সিআইডি প্রধান বলেন, জুলাই ১৫ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ১১৪টি কবরের মরদেহ উত্তোলন ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে প্রোফাইলিং করা হয়েছে। অজ্ঞাত শহীদদের ৯টি পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে আমরা আজ ৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করেছি। আর একজন শহীদের নাম জিলানি। তার পরিবার সৌদি আরবের মদিনায় বসবাস করে। জিলানির জন্ম ও বেড়ে ওঠা মদিনায়। জুলাই আন্দোলনে ছুটিতে দেশে এসে তিনি যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। টানা আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি ৩ আগস্ট বনানী এলাকায় মারা যান। তার বোনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, কিন্তু ডিএনএ মেলেনি। আমরা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। এবার জিলানির ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে আমরা চেষ্টা করব।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডিএনএ প্রোফাইলিং করার পর যথাযোগ্য মর্যাদায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পুনরায় আমরা তাদের কবরস্থ করেছি।

২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর বিশেষ প্রস্তুতি শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে অজ্ঞাত শহীদদের পরিচয় শনাক্তে লাশ উত্তোলন শুরু করে সিআইডি। এই কাজে আর্জেন্টাইন নাগরিক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজিস্ট ও ফরেনসিক কনসালটেন্ট ড. লুইস ফনডেরিডার-এর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় নমুনা সংগ্রহের কাজ চলে।

দৈনিক পুনরুত্থান / নিজস্ব প্রতিবেদক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন