• ঢাকা
  • শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬, ২০ পৌষ ১৪৩২

Advertise your products here

  1. জাতীয়

এখনো উদ্ধার হয়নি লুণ্ঠিত হওয়া ১৩৩৫ অস্ত্র


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: শনিবার, ০৩ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২:২৭ পিএম
এখনো উদ্ধার হয়নি লুণ্ঠিত  হওয়া  ১৩৩৫ অস্ত্র

দেশে গত এক বছরে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রে খুনাখুনির ঘটনা বেড়েছে। এই সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতায় আড়াই শতাধিক বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়। নিহত হয় শতাধিক ব্যক্তি। এসব ঘটনায় জুলাই গণ-আন্দোলনের সময় বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই সময় দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশি স্থাপনা থেকে পাঁচ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে গণভবন থেকে লুট হওয়া স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৩২টি ভয়ংকর অস্ত্রও রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানে বেশির ভাগ অস্ত্র উদ্ধার হলেও এক হাজার ৩৩৫টি অস্ত্র এখানো উদ্ধার হয়নি। দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৮৯টি গুলি এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এর বাইরে গুলিতে আরো অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিহত হন। এরই ধারাবাহিকতায় চাঁদা না পেয়ে বেপরোয়া সন্ত্রাসীরা গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রামের চকবাজার থানা এলাকার এক শীর্ষ ব্যবসায়ীর বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।

গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে, আগামী জাতীয় সংসদ র্নিবাচনের আগে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে দেশে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে।

এর সঙ্গে থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের ১৩ শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় এসব অস্ত্র অপরাধীর হাতে চলে গেছে। এসব অস্ত্রে হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করার প্রমাণ রয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় কিশোর গ্যাংসহ অন্য সন্ত্রাসীদের হাতে এখন অনেক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সীমান্ত দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করছে। থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী তৎপর রয়েছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া এসব আগ্নেয়াস্ত্র। দ্রুত এসব অস্ত্র উদ্ধার করে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।

নির্বাচন সামনে রেখে থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে তৎপরতা বাড়াতে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন মহাপরিদর্শক

(আইজিপি) বাহারুল আলম। গত ২৯ ডিসেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরে মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় তিনি এ নির্দেশ দেন।

দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশি স্থাপনা থেকে পাঁচ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে গণভবন থেকে লুট হওয়া এসএসএফের ৩২টি ভয়ংকর অস্ত্রও রয়েছে। সারা দেশে থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের এক হাজার ৩৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র গত ১৭ মাসেও উদ্ধার হয়নি। পুলিশ বলছে, এর বেশির ভাগ চলে গেছে সন্ত্রাসীদের হাতে।

অবৈধ অস্ত্রে বাড়ছে খুনাখুনি : গত বছর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ উসমান হাদি শহীদ হওয়া ছাড়াও অর্ধশতাধিক ব্যক্তি রাজনৈতিক বিরোধের কারণে গুলিতে নিহত হন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ব্যস্ততম সড়কে আব্দুল হাকিম নামের একজনকে গুলি করে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। গত ২০ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাউজানে এক রাজনৈতিক কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত ২১ জুন নরসিংদীর পলাশে দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত ঈসমাইল হোসেন ছয় দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান।

অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রে ফের বেপরোয়া: সূত্র বলছে, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর অন্তত ছয়জন শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পান। এর মধ্যে রয়েছেন—হাজারীবাগ এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, ‘কিলার আব্বাস’ হিসেবে পরিচিত মিরপুরের আব্বাস আলী, মোহাম্মদপুরের ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, ঢাকার অপরাধ জগতের আরো দুই সদস্য নাঈম আমেদ ওরফে টিটন, খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু ও পূর্ব রাজাবাজার এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী আসলাম হোসেন ওরফে সুইডেন আসলাম। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, জামিনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগিতায় দেশে নতুন করে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১ আগস্ট রাত সোয়া ৯টার দিকে রাজধানীর মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সামনে জামাল হোসেন নামের একজনকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় জড়িত ‘শ্যুটার’ এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সহযোগী। সাম্প্রতিক সময়ে আরো দুজনকে গুলি করে হত্যা করে বলে তথ্য পেয়ে তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ।

পুলিশের বিশেষ অভিযান : বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারসহ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ অভিযানে এ পর্যন্ত ১৩ হাজারের বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় ১৬২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু করে। ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত তারা ৩১৮টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে। এ সময় ১৭৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গত বছর আন্দোলন চলাকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানা থেকে এক হাজার ৮৯৮টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে বিভিন্ন মডেলের রাইফেল, পিস্তল, শটগান, সাবমেশিনগান (এসএমজি), লাইট মেশিনগান (এলএমজি) এবং গ্যাসগান ছিল। এর মধ্যে ৩৪৮টি চায়না রাইফেল, ৭০৩টি শটগান, ৩০টি এসএমজি (টি-৫৬ চায়না মডেল), ১৩টি এলএমজি, ৮৯টি পিস্তল (টি-৫৪ চায়না), ৫৬০টি পিস্তল রয়েছে।

সীমান্তে বিজিবির ৬৪ অস্ত্র উদ্ধার : বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র বলছে, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত থেকে সম্প্রতি ৬৪টি বিভিন্ন ধরনের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া চার হাজার রাউন্ডের বেশি গুলিসহ শতাধিক হাতবোমা, হ্যান্ড গ্রেনেডসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র বলছে, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে। এর মধ্যে রয়েছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া, কুমিল্লা, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের রহনপুর, একই এলাকার সোনামসজিদ, আজমতপুর, বিলভাতিয়া, ঝিনাইদহের মহেশপুরের জুলুলি, সাতক্ষীরার কলারোয়ার তলুইগাছা ও শাঁকারা, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ার সীমান্ত এলাকা।

বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিনষ্ট করার লক্ষ্যে কিছু অসাধু চক্র সীমান্ত দিয়ে দেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র আনার চেষ্টা করছে।

র‌্যাবের অভিযান জোরদার : র‌্যাব মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, র‌্যাব গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৮৪টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে।

মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে দেশে খুনাখুনি নিয়ন্ত্রণে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে না পারলে হানাহানি বাড়তে পারে।

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন