• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১২ ফেরুয়ারী ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২

Advertise your products here

  1. জাতীয়

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার কতটা সফল-কতটা ব্যর্থ


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১২ ফেরুয়ারী, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৭:৪৯ এএম;
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার কতটা সফল-কতটা ব্যর্থ

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রায় আঠারো মাসের এই সাফল্য-ব্যর্থতার সরকারের মেয়াদ শেষে নানান আলোচনা চলছে রাজনৈতিক মহলে। সামনে চলে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা ও সফলতার প্রশ্ন। বিবিসি বাংলা

সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে, এ সরকারের মূল্য লক্ষ্য ছিল তিনটি—সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার’ এবং সরকার ঘোষিত রূপরেখার মধ্যেই সংসদ নির্বাচন আয়োজন।

এসব ক্ষেত্রে ‘সফল’ কিংবা যথেষ্ট অগ্রগতির দাবি করা হচ্ছে সরকারের দিক থেকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার মোটা দাগে তিন এজেন্ডাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে কিছুটা সাফল্য দেখালেও সরকারের ভেতরেরই একটি অংশের কারণে সংস্কার কিছুটা পথভ্রষ্ট হয়েছে, আর বিচারের ক্ষেত্রে ‘বিচার নাকি প্রতিশোধ’ সেই প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তারা মনে করেন, শুরু থেকেই মব সংস্কৃতি এমনভাবে চলেছে এবং তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে একটি শক্তির কাছে সরকার আত্মসমর্পণ করেছে। এছাড়া আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় ব্যর্থতার পাশাপাশি নারীর সমতার ক্ষেত্রটিও এ সরকারের আমলে বড় ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সরকার তুলনামূলক ভালো করলেও সামাজিক ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হয়েছে। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নির্বাচনের দিকে এগুতে পারাটাও সরকারের একটা সাফল্য বলে মনে করেন তিনি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, সংস্কারের বিষয়ে সরকার কিছুটা পথভ্রষ্ট হয়েছে, আর বিচারের ক্ষেত্রে ‘বিচার নাকি প্রতিশোধ’ সেই প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা সরকার চাইলে এড়াতে পারতো বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মব সন্ত্রাস, যাদের হামলায় গত দেড় বছরে আক্রান্ত হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই সংবাদপত্র ভবন থেকে শুরু করে বহু মাজার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারক।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০০৪ সালের ৮ই অগাস্ট ক্ষমতায় এসেছিল ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার। এরপর তিনি ‘সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনকেই’ তার সরকারের মূল এজেন্ডা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার চাপের মুখে প্রথমে প্রধান উপদেষ্টা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলেছিলেন।

পরে এক পর্যায়ে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনার পর সরকার ও বিএনপি যৌথভাবে ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগেই নির্বাচনের ঘোষণা দেয়।

শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেদিন একই সঙ্গে সংস্কার প্রশ্নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।

এর আগে সরকার শুরুতেই রাষ্ট্রসংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক মোট ১১টি কমিশন গঠন করে এবং সেসব কমিশনের সুপারিশসহ রাষ্ট্রসংস্কারের জন্য দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়।

শেষ পর্যন্ত অন্তত ত্রিশটি বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর মধ্যে চারটি প্রশ্নে গণভোট হতে যাচ্ছে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই।

সরকার নিজেও সেই গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করেছে। যদিও ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, সংস্কার কমিশন ও জুলাই চার্টারের কৃতিত্ব সরকার নিতে পারে।

আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এর এক আলোচনায় বলেছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যতটা সংস্কার হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত কম সময়ে তেমনটি এর আগে আর হয়নি।

তবে গণভোটে 'না' ভোট জয়ী হলে শেষ পর্যন্ত সরকারের সব সংস্কার উদ্যোগ ভেস্তে যায় কি-না তা নিয়েও অনেকের মধ্যে কৌতূহল আছে। ইতোমধ্যেই একটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

এ মামলার অপর আসামি পুলিশের আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে ( রাজসাক্ষী) পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ১৭ই নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করে। এছাড়াও গত অক্টোবরে আইন মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্দেশে হত্যার অভিযোগে মোট ৮৩৭টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫টি মামলার বিচারকাজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে।

এ ছাড়া তখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন ফৌজদারি আদালতে পুলিশ ১৯টি হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেছিল। এসব হত্যা মামলা বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশে গত দেড় বছরের বেশি সময়ে মানবাধিকার সংগঠক ও সংস্থাগুলোর কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, কারা ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, আর মব সন্ত্রাস। এই সময়কালে বারবার সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা আলোচনায় এসেছে।

এমনকি এবার নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পরে বসত বাড়িতে আগুন, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ভালুকায় পিটিয়ে আগুন দিয়ে দিপু চন্দ্র হত্যা এবং পর পর কয়েকজন হিন্দু ব্যবসায়ী খুন হওয়ার ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে।

তবে সরকারের দিক থেকে সবসময়ই বলা হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘরে হামলার বেশিরভাগ ঘটনা রাজনৈতিক কারণেই ঘটেছে, ধর্মীয় কারণে নয়। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর– অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ১৪ মাসে দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রে রূপান্তরের জন্য জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদ স্বাক্ষর এবং ২৫টির মতো ডান, বাম মধ্যপন্থী দলগুলোর মধ্যে অন্তত ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোকেই বড় অর্জন হিসেবে সরকারের লোকজন মনে করছে।

তাছাড়া সরকার মনে করে, সবকিছুতে সংস্কার বাস্তবায়ন না করা গেলেও কোন কোনো জায়গায় সংস্কার দরকার এবং সেখানে করনীয় কি সেটি সরকার চিহ্নিত করতে পেরেছে সংস্কার কমিশনগুলোর মাধ্যমে।

ইতোমধ্যেই সাংবিধানিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ হিসেবে আরপিওতে সংশোধনী আনা হয়েছে। আর বিচারের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার একটি মামলার রায় ছাড়া গুম খুনের বিচার শুরু করাকে অর্জন হিসেবে দেখছে সরকার। কারণ সরকার বলছে, মামলাগুলোর তদন্তের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন ছাড়াও দ্রুত বিচারের জন্য যা যা করণীয় সেসব পদক্ষেপও যথাসময়ে সরকার নিতে পেরেছে।

এছাড়া গুম খুনের মামলায় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনাকেও সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক অর্জন বলে সরকারের দিক থেকে মনে করা হচ্ছে।

ক্ষমতায় আসার পরপরই আর্থিক খাতে সংস্কার এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। আওয়ামী লীগ আমলে হওয়া 'আর্থিক খাতের দুর্নীতি' নিয়ে একটি শ্বেতপত্রও প্রকাশ হয়েছে সরকারের উদ্যোগে।

অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন সম্প্রতি বলেছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে একটি চ্যালেঞ্জিং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পাওয়ার পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি সহনশীলতা দেখিয়েছে এবং ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে।

সরকারের দাবি অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার যা আইএমএফ এর ঘোষিত পদ্ধতি অনুযায়ী এখন ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এছাড়া ব্যাংক খাতেও স্বস্তি ফিরে আসার দাবি করছে সরকার এবং এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দুর্বল ৫টি ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে।

তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হতে পারেনি। চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ডিসেম্বর মাসের মূল্যস্ফীতির যে চিত্র প্রকাশ করেছে, সে অনুযায়ী, ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর আগে নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

তবে এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে পারাটা তাদের জন্য একটি সাফল্য, বিশেষ করে গত বছর রোজায় দ্রব্যমূল্য খুব একটা বাড়েনি বলেই মনে করছেন তারা। যদিও চালের দাম না কমার কারণে খাদ্যমূল্যস্ফীতি কমেনি বলে অর্থনীতিবিদরা বলছেন।

সরকার বলছে, জোরপূর্বক গুম, খুন বন্ধ হয়েছে এবং পুলিশ বাহিনীকে সক্ষম করে তোলা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে সরকার মনে করে।

তবে কারাগারে কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকার বলছে, আগের মতো সরকার এগুলো প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।

সরকারের শুরুর দিকে ১৬৭ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। পরে সরকার নিজেই সেটি ভুল পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এখন সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে যে, এই ঘটনা ছাড়া সরকারের পদক্ষেপের কারণে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়নি বরং প্রেস ফ্রিডমের উন্নতি হয়েছে। যদিও বেশ কিছু সাংবাদিককে আটক এবং গণমাধ্যমের ভবনগুলোতে হামলা মত প্রকাশ কিংবা স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপরই হামলা হিসেবে বলছেন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা।

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন